কিছু আশাবাদী গল্প…
আগে ইয়াহু ৩৬০ তে নিয়মিত ব্লগ লিখতাম। একবার ওখানে স্বপ্ন উৎসব হয়েছিলো…সেই স্বপ্ন উৎসবে লেখা ব্লগ
১.
আজকাল যেদিকে তাকাই শুধু বিষন্নতা দেখি। চারপাশের মানুষগুলোকে হতাশা যেন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে…। বাতাসে কান পাতলে মনে হয় শুধু দীর্ঘশ্বাস শুনছি। সবখানে একই কথা,সবখানে হতাশা …কেমন হয়ে যাচ্ছে সবকিছু …কেমন যেন। এরই মাঝে একজন আমাকে একটা আশাবাদী কবিতা লিখতে বললো…। কাব্যচর্চায় আমি রীতিমতো শিশু…। তার উপর আবার ফরমায়েশি কবিতা। তবু আইডিয়াটি ভালো লাগলো … লিখতে শুরু করলাম। কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখলাম আমি লিখতে পারছি না। কবিতা মানুষের ভেতর থেকে আসতে হয়। আশাবাদী না হলে জোড় করে আশার কবিতা লেখা যায় না। তার পরেও অনেক কষ্টে অনেক পুষ্টিহীন কয়েকটা লাইন লিখলাম…
ঘুমাবো না আজ।
আমি জেগে থাকবো,
স্বপ্নগুলোকে পাহারা দেব সারারাত।
তুমিও আজ জেগে থাকো
বন্ধু আমার,
আমার হাতে রাখো তোমার হাত।
এ আকাশ থেকে কাল সকালেই
মেঘের হবে ছুটি
রোদ্দুরেতে হাত ভেজাবো,
খরার বুকে
হারিয়ে যাবে বিষন্নতার নদী।
কবিতাটি অসমাপ্তই থেকে গেলো…। ভাবলাম মুছে দেব। কিন্তু আবার মনে হলো থাক…আশা মুছে ফেলতে নেই…
২.
‘‘রেখে যাবার মতো একটি জিনিসই আমার আছে, তাহল আমার স্বপ্ন। …সারা জীবন প্রচন্ড আবেগ নিয়ে সেই স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করতে জগতের আর সবকিছু ভুলে ক্লান্তিহীন আমি ছুটে চলেছি। জানি না আরদ্ধ কাজ সফল করার পথে কতটুকু এগিয়ে যেতে পারলাম।জানি না সেই পথের কোনখানে এসে আজ আমাকে থেমে যেতে বাধ্য করা হলো।যদি লক্ষ্যে পৌছাবার আগে মৃত্যুর শীতল হাত তোমাকেও স্পর্শ করে তবে আরদ্ধ কাজের দায়িত্ব তোমার উত্তরসূরীদের হাতে অর্পণ করো,যেমন আমি এগিয়ে গেলাম।এগিয়ে চলো সামনে এগিয়ে চলো,পিছিয়ে পড়ো না,মুহূর্তের জন্য না…’’
আমার মাথার পেছনের দেয়ালে মাষ্টারদা সূর্যসেন, রুমের পূর্বসূরীর রেখে যাওয়া। অনেক দিন ধরে পোষ্টারটার দিকে তাকানো হয় না। আজ সেই প্রাক্তন রুমমেটের কথা মনে হতেই তাকালাম। আমার রুমের এই পূর্বসূরীটি পাশ করার পর অনেকদিন চাকরি পাচ্ছিলেন না।সেই দাদার বিষন্ন মুখের দিকে তাকালেই মনটা খারাপ হয়ে যেত। কিন্তু প্রায় এক বছর বসে থাকার পর তিনি খুব ভালো একটা চাকরি পেলেন…। আজ পোষ্টারটির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। মনে হলো- হতাশার পাশেই তো আশা থাকে,শুধু খুঁজে নিতে হয়…
৩.
মাত্র কদিন আগের ঘটনা। ইরতেজা ভাই আমার ‘মা’ কবিতাটি স্যামহয়ারইন ব্লগে দেয়ার পর একজন মন্তব্য লিখেছেন, তিনি নাকি এই কবিতাটি আগে কোথায় পড়েছেন(!)…তবে তিনি নিশ্চিত না কোথায়। আমি অন্য কবিদের কবিতা খুবই কম পড়ি। পছন্দের কিছু কবিতাই বারবার পড়ি । কারণ ভয় হয়…আমার কবিতায় যদি অন্য কোন কবির কবিতার ছায়া চলে আসে। এই ভয়ংকর কথাটি শোনার পর মাথায় রক্ত উঠে গেলো। পৃথিবীতে দু’জন মানুষের চেহারা অনেক সময় এক হয়, কিন্তু কখনো দুটি কবিতার চেহারা এক হয় না। খুব কষ্ট পেলাম…। ভাবলাম,আর কোন কবিতাই লিখবো না…। ঠিক তখনই ড. জাফর ইকবাল স্যারের ‘রঙ্গিন চশমা’ বইয়ে পড়া একটা গল্প মনে পড়ে গেলো। জাফর ইকবাল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাঁর লেখা ‘কপোট্রণিক ভালোবাসা’ নামক একটি সায়েন্স ফিকশান ছাপা হয়েছে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় । গল্পটি বের হবার পর কে যেন অভিযোগ করলো, জাফর ইকবাল রাশিয়ান সায়েন্স ফিকশন ‘আইভা’ থেকে নাকি গল্পটি হুবুহু টুকলিফাই করেছেন ! স্যারের তখন বয়স কম, তার ইচ্ছে হলো সেই মানুষটাকে ধরে কাঁচা খেয়ে ফেলেন । তিনি চিন্তা করলেন একটি প্রতিবাদলিপি পাঠাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পাঠালেন না। যা করলেন তা হলো, ‘কপোট্রণিক’ নামক সিরিজে গল্প পর গল্প লিখতেই লাগলেন…। আমি ভেবেছিলাম স্যামহয়ারইন ব্লগে সদস্য হয়ে সেই মানুষটার মন্তব্যের জবাব দেব। কিন্তু ‘রঙ্গিন চশমা’য় পড়া ঘটনাটি মনে পড়ার পর আমার সব কষ্ট এক নিমিষেই উড়ে গেলো। সেদিন একটি নতুন কবিতা লিখে ফেললাম। শুধু তাই না,টেকনোলজি টুডে’র পরবর্তী সংখ্যার লেখাগুলো অলসতা করে লেখা হচ্ছিল না…সেগুলোও শুরু করলাম।
পাঠক,এই গল্পটা বলার পেছনে একটা কারণ আছে। কারণটি হচ্ছে এই ঘটনাটির পর একটি নতুন জিনিস শিখলাম। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম, সফল মানুষের গল্প শুনলে হতাশা,কষ্ট,রাগ…সব এক নিমিষেই দূর হয়ে যায়। আসলে আমরা হতাশার কথা শুনেই পাল্টে যাচ্ছি… প্রতিদিন একটু একটু করে । এখন সময় আশার গল্প শোনার…
৪.
আমাদের ব্যাচের উদ্যোগে বুয়েটে একবার বিজয় দিবসের একটা অনুষ্ঠান হয়েছিলো। সেই অনুষ্ঠানের জন্য আমার কয়েকজন বন্ধু মিলে মাত্র দুই রাতে মুক্তিযুদ্ধের উপর দশ মিনিটের প্রামাণ্য স্লাইড শো তৈরি করেছিলাম। দশ মিনিটের মাঝে মহেঞ্জাদারো সভ্যতা থেকে রেসকোর্স – কে তুলে আনা কিন্তু মোটেও সহজ কথা নয়। কিন্তু এই কঠিন কাজটি আমরা পেরেছিলাম, কারণ আমরা কয়েকজন ছিলাম। এই কাজটা করার পর ১৯৭১ কে একটু অন্যভাবে অনুভব করলাম। তাই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের উপর একটি স্বয়ংসম্পূর্ন মাল্টিমিডিয়া তৈরি করার প্রস্তাব দিলাম আমার বন্ধুদের। সবাই খুব আগ্রহ দেখালো, কিন্তু দুঃখজনকভাবে কাজের সময় তেমন কেউ সময় দিতে পারলো না। একা একা কিছুদিন চেষ্টা করলাম,তারপর হাল ছেড়ে দিলাম। স্বপ্নটা আর আলোর মুখ দেখলো না…
আসলে সত্যি কথা বলতে কি, স্বপ্ন একা দেখা যায় না। স্বপ্ন সবাই মিলে দেখতে হয়…। স্বপ্ন কেবল নিজের মাঝে চেপে রাখতে হয় না,স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিতে হয় চারপাশে…। স্বপ্নের কথা চিৎকার করে জানাতে হয় পৃথিবীটাকে…তাহলে কেউ না কেউ এগিয়ে আসে ,যার হাত ধরে সেই স্বপ্নের পথে হেঁটে যাওয়া যায়…
৫.
এই লেখার শিরোনাম ‘কিছু আশাবাদী গল্প…’, ভেবেছিলাম এমন সব গল্প লিখবো, যেসব গল্প এক নিমিষে সব হতাশা ভুলিয়ে দেবে। আশাবাদী গল্পের খোলসে এতোক্ষণ যেসব গল্প বলেছি তাতে আমার হতাশা এক ফোঁটাও কমেনি, উল্টো বেড়ে গেছে। আসলে বাস্তব গল্প সমসময় হতাশা ঢেকে দিতে পারে না। বাস্তবতা নির্মম হয় অনেক সময়। কিন্তু স্বপ্ন নির্মম হয় না। স্বপ্ন সব সময়েই সুন্দর হয়… । তাই এবার বাস্তব ঘটনার চেয়ে বরং কোন স্বপ্নপূরণের গল্প বলি…। আমি গল্প লিখতে পারি না। কারণ আমার জীবনে তেমন কোন গল্প নেই। তবু হাল ছাড়লাম না,আমাকে আজ আশাবাদী হতেই হবে…। আশাবাদী কবিতার মতো অনেকটা জোড় করেই আশাবাদী গল্প শুরু করলাম …
আমার গল্পের নায়ক তখন স্কুলে পড়ে। ছাত্র হিসেবে রীতিমতো গাধা টাইপের। বর্তমান সময়ের লাফঝাঁপ দিয়ে গণিত উৎসবে অংশ নেয়া ছাত্র-ছাত্রীদের মতো না মোটেও। গণিত তার কাছে মোটেও উৎসবের ব্যাপার না…। গণিতের নামে তার জ্বর আসে। কারন, সে গণিতে ১০০ তে ১৩ পাওয়া ছাত্র। বাবা আর গৃহশিক্ষকের নিয়মিত উত্তম মাধ্যমে গায়ের চামড়া গন্ডারের মতো হয়ে যাওয়া ছাড়া আর তেমন কোন লাভ হয়নি। পরীক্ষা খারাপ হলেও তাই এখন আর ছেলেটি গায়ে মাখে না। তবে প্রতি বছরেই দুটি দিনে ছেলেটির মন খুব খারাপ থাকে…। দিন দুটি হচ্ছে- মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের পরের দিন। বছরের এই দুটি দিন পত্রিকার পাতা হাস্যমুখী কিছু ভালো ছাত্রদের ছবিতে ভরে থাকে। অমুক ছাত্র তমুক বোর্ডে এতো নম্বর পেয়ে সম্মিলিত মেধা তালিকায় এতো হয়েছে , সেই ভালো ছাত্রের দু পাশে তার গর্বিত পিতা মাতা। এসব দিনে ছেলেটির বাবা-মা বিষন্ন মুখে পত্রিকার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন,ইস্ আমাদের ছেলেটা যদি… । ছেলেটি দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায়। তার পত্রিকার পৃষ্টাগুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ছেলেটি তা করে না। একদিন সেও স্বপ্ন দেখতে শুরু করে…। কারন মানুষ স্বপ্ন ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না। ছেলেটি স্বপ্নের পথে হাঁটতে শুরু করে…। ভাবে, দেখাই যাক না কি হয়…। একদিন
ছেলেটির স্বপ্ন পূরণ হয়, খুব ভালোভাবে না হলেও পূরণ হয়…। এর কারণ সম্ভবত একটাই, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। এই পৃথিবীতে মানুষ ছাড়া নাকি অন্য কোন প্রাণী স্বপ্ন দেখে না, সৃষ্টিকর্তা স্বপ্ন দেখা আর পূরণের ক্ষমতাটি শুধু মানুষকেই দিয়েছেন…
প্রকাশকালঃ 15 Nov 2007 01:44 pm 0 টি মন্তব্য


