টিউশনি বানিজ্য
ঢাকার টিউশনির বাজারে বুয়েট ছাত্রদের মূল্য বরাবরই একটু চড়া । আমার কোন কোন বন্ধু ৪/৫ টা টিউশনি করে। আর এই টিউশনি বানিজ্যে তাদের আয়ের অংকটা এমন যে,অনেকেই বেশ চিন্তিত এখন। কারণ, পাশ করে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেও এতো আয় করা যাবে না। কারো আবার টিউশনির কল্যাণে ব্যাংকে লাখখানেক টাকাও আছে।ছাত্রীর সাথে প্রেম করার ঘটনাও খুবই সাধারণ ব্যাপার। অবশ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টিউশনি শেষ হবার সাথে সাথে এসব প্রেমের অপমৃত্যু ঘটে। আমার খুব কাছের একবন্ধু এক দুপুরবেলায় আমার কাছে এলো। তার কিছু টাকা ধার লাগবে,ছাত্রীকে নিয়ে বসুন্ধরা স্টার সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখতে যাবে। ছবির নাম ‘বিদ্রোহী পদ্মা’। আমার সেই বন্ধুর ছাত্রীটিও এইচ এস সি পরীক্ষার পরপরই প্রেমে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলো বলেই শুনেছি ।যাই হোক, বুয়েটের টিউশনি বানিজ্যে সবচেয়ে কাঁচা খেলোয়াড় সম্ভবত আমিই, সমগ্র বুয়েট লাইফে মাত্র এক মাস টিউশনি করেছি।
আমার জীবনে প্রথম আয় সিলেটের সানরাইজ কোচিং সেন্টার-এ, বুয়েটে চান্স পাবার পর। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের পদার্থ বিজ্ঞানের দুটি ক্লাস শেষে খামে বন্দী তিনটা একশ টাকার নোট পেয়ে বেশ ভালো লাগছিল। শত হোক, নিজের প্রথম আয়ের টাকা! রিকশায় বসে বাসায় যেতে যেতে ভাবছি, বুয়েটে এসে চুটিয়ে টিউশনি করে টাকা কামাবো। কিন্তু বুয়েটে ভর্তি হবার সময় আমার পিতৃদেব গম্ভীর মুখে আমায় বললেন,টিউশনি করার দরকার নেই,ভালোভাবে পড়াশুনা করবি।আমি বাবার প্রথম কথাটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি,শুধু দ্বিতীয় কথাটাও পালন করতে পারিনি।
এবার আসা যাক প্রথম টিউশনির কথায়। ২য় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের(লেভেল-২/টার্ম-১)ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছি। তখন শীতকাল। আমি আর আমার বন্ধু সামী IELTS কোচিং-এ ভর্তি হয়েছি। তাই হলে আছি। সপ্তাহে ৩দিন ক্লাস। আমার রুমে ডিপার্টমেন্টের টিচার ফাইটার(বুয়েটের হবু টিচারদের টিচার ফাইটার বলা হয়) বন্ধু কৌনিশ আর আমি থাকি। দুজনে সারাদিন মুভি দেখি,গেম খেলি,আড্ডা দেই। মাঝে মধ্যে সময় কাটানোর জন্য ভোরে উঠে জিমনেশিয়ামে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি করি। কিন্তু এভাবেও সময় কাটে না আমাদের। তাই দুজনেই ঠিক করলাম, টিউশনি করবো। কৌনিশ একদিন গিয়ে প্রথম আলো-তে ‘পড়াইতে চাই’ নামে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আসলো। আমি ভাবলাম কদিন পর দেব। বিজ্ঞপ্তিতে আমার মোবাইল নাম্বার দেয়া হয়েছিলো,কৌনিশের তখন মোবাইল ছিল না। উৎসাহী কয়েকজন কৌণিশের দেয়া সেই ‘পড়াইতে চাই’ বিজ্ঞাপনকে ‘পাত্রী চাই’ ভেবে বসলেন কিনা কে জানে!সেই রাতেই ভয়াবহ সাড়া পাওয়া গেলো। এক মেয়ে ফোন করে বলল,আমি আপনার কাছে পড়তে চাই।ঠিকানা জানতে চাইলে সে উত্তর দিলো,আমিতো অনেক দূরে থাকি…আপনি পড়াতে পারবেন না [নেপথ্যে অনেক নারী কন্ঠের হাসির শব্দ]।এভাবে আরও কিছু ফোন আসলো। কাজের কাজ কিছুই হলো না। কৌনশকে সান্তনা দিলাম, ৪০০ টাকার বিজ্ঞাপনে এমন কিছু সস্তা আনন্দ পাওয়া গেছে এইবা কম কি! আমার বিজ্ঞাপন দেয়ার যে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিলো সেটাও উড়ে গেলো।কিছুদিন পর কোন বিজ্ঞাপন ছাড়াই আমার একটা টিউশনি জুটে গেলো।স্কুলের বন্ধু প্রনবের মেসে নটরডেম কলেজের দুই ছাত্রকে পড়াতে হবে।একজন ঐ মেসেই থাকে,আরেক জন বাসা থেকে এসে পড়বে।তিন হাজার দেবে।পড়াতে হবে পদার্থ আর রসায়ন ।
শুরু হলো প্রথম টিউশনি।আরামবাগের এক মেসে গিয়ে পড়াই।ছাত্র দুইজন অতিশয় ফাঁকিবাজ।পড়া দিলে কিছুই পড়ে না।নানা রকম অজুহাত দেখায়। যে মেসে থাকে সে মোটামুটি পড়ে,আর আরেক জন আমি পড়ানো শুরু করলে প্রায় এক ঘন্টা পরে আসে।মাঝে মাঝে আসে না।এরই ধারাবাহিকতায় সে একদিন ফোন করে জানালো পড়তে আসবে না,শরীর খারাপ। আমি অন্যজনকে পড়িয়ে হলে ফেরার পথে দেখি আমার অসুস্থ(?) সেই ছাত্রটি বুয়েট মাঠে ক্রিকেট খেলছে! অসুস্থ ছেলে পড়া ফেলে ক্রিকেট খেলছে।একটু রাগ হলেও কল্পনায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত দেখতে পেলাম যেন । তবে না পড়িয়ে টাকা নেয়াটা অন্যায়, তাই কোনভাবে এক মাস পূর্ণ করে টিউশনিটা ছেড়ে দিলাম।
মাঝে অনেক দিন টিউশনির দেখা নেই। অরেকটা টিউশনির প্রস্তাব আসলো,আমি লেভেল-৩,টার্ম-২ তে তখন। স্কুলের আরেক এক বন্ধু [ সিলেট মেডিকেলে পড়ে ] ফোন করলো,দোস্ত আমার শালাকে তোর একটু পড়াতে হবে।এবার এইচ এস সি পরীক্ষা দেবে। আমি বললাম,হারামজাদা! তুই আবার বিয়ে করলি কবে? দাওয়াত দিলি না? সে একটু থতমত খেল মনে হয়।আমতা আমতা করে বললো,না মানে …ইয়ে…আমার গার্লফ্রেন্ডের ছোট ভাই আর কি…।আজকাল পোলাপান গার্লফ্রেন্ডকে বউ বলে ডাকে। টিউশনির মতো বুঝি প্রেমটাও অধরাই থেকে যাবে এই বুয়েট লাইফে। বুকের ভেতর কেমন যেন শুণ্যতা অনুভব করলাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, হুম……ঠিক আছে পড়াবো। বন্ধুর কাছ থেকে তার হবু শ্বশুড়বাড়ির নাম্বার পেলাম। সন্ধ্যায় ফোন দিলাম ,আন্টি ধরলেন।প্রাথমিক পরিচয় পর্ব শেষে আমাদের কথাবার্তা ছিল মোটামুটি এরকম-
: আন্টি আমি কখন পড়াতে আসবো?
: বাবা তুমি সাতটায় আসলে ভালো হয়।
: আমি আন্টি ৬টায় আসি? আমার তো ৫টায় ক্লাস শেষ।
:কি তোমাদের বুয়েটে এতো সকালে ক্লাস শেষ হয়? [উনি আমাকে সকাল সাতটায়(!) আসতে বলেছেন এই মাত্র বুঝতে পারলাম]
:আন্টি ,আমার সকাল ৫টায় না বিকাল ৫ টায় ক্লাস শেষ হয়।আমার ক্লাস শুরু হয় সকাল আট টায়।
: ও…তাহলে সকাল ৬টায় আসো
: আন্টি এতো সকালে তো আসা যাবে না।
: আচ্ছা বাবা,তুমি তাহলে বাসায় আসো…আলাপ করে দেখি।
নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত হলাম।বাড়ি খুঁজে পেতে বেশ সমস্যা হলো।এবারও একই অনুরোধ,সকালে আসতে হবে।ছেলে নাকি সকাল দশটার আগে ঘুম থেকে উঠে না।আমাকে জাগিয়ে ওকে পড়াতে হবে! গ্রামে মুরগির ডাকে ঘুম ভাঙ্গে,আর এ ছেলের ঘুম ভাঙ্গবে আমার ডাক শুনে।মুখ যথাসম্ভব গম্ভীর করে বললাম,দেখুন আন্টি কাউকে টিউটর রেখে কি আর ঘুম থেকে জাগানো যায়,আমি ওকে ভালোভাবে বুঝিয়ে অভ্যাস পরিবর্তণ করতে পারি কিনা চেষ্টা করে দেখতে পারি।আন্টি আমার কথায় খুব একটা সন্তুষ্ট হলেন না বলেই মনে হলো।নাস্তা হিসেবে এক গ্লাস পানি আর কিছু আধ-ভাঙ্গা বিস্কুট দেয়া হলো। ভদ্রতা রক্ষার্থে পানিটুকু খেলাম।আন্টি বললেন,তাহলে শনিবার সন্ধ্যায় আসো। হলে ফেরার পথে মনে হলো টিউশনিটা করানো ঠিক হবে না। কিন্তু আমার খুব কাছের বন্ধু…তাকে কিভাবে ‘না’ বলি? আমার মনের কথাটি বোধ হয় আন্টি বুঝতে পারলেন। শনিবার সকালে ফোন করে জানালেন,আপাতত টিউটর লাগবে না,ছেলে একটা কোচিং-এ ভর্তি হয়েছে। এরপর সেই বন্ধুটি ভয়ে প্রায় দুই মাস আমাকে ফোন করলো না।দু’মাস পর ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করলো।
এর পর আরও কয়েকটি টিউশনির অফার এসেছিলো। তবে ব্যাটে বলে হয়নি বলে আর করানো হয় নি। মাঝে মাঝে এ নিয়ে খুব আফসোস হতো। এবার চট্টগ্রামে বসে ড. জাফর ইকবাল স্যারের ‘রঙ্গিন চশমা’ বইটা পড়লাম। এই বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় তিনি প্রাইভেট টিউশনিকে অন্যুৎসাহিত করেছেন।এখন আফসোস হলে,এই ভেবেই নিজেকে সান্তনা দেই!
প্রকাশকালঃ 23 Nov 2007 08:10 am 3 টি মন্তব্য



ইন্টারেস্টিং ও মজার অভিজ্ঞতা।
আমি কখনো বাসায় গিয়ে কাউকে পড়াইনি, তবে বুয়েটে থাকার সময়ে হলে আমার রুমে ব্যাচে অনেককে প্রোগ্রামিং শিখিয়েছি। ২য় বর্ষ হতে বাড়ি থেকে টাকা আর নেইনি, বরং আমার বাবার হার্ট সার্জারী, আমাদের বাড়ি তৈরী এগুলোতে সাহায্য করতে পেরেছি।
টিউশনি জিনিসটাতে দোষের কিছু নেই, তবে মাত্রা ছাড়ালেই সমস্যা। আমার পরিচিত একজনে ১৪টা টিউশনি করাতো। পড়ালেখা সব মাথায় উঠেছিলো। কিন্তু সে ব্যতিক্রম, আমার অন্য বন্ধুরা গোটা দুয়েক করে টিউশনি করিয়েও দিব্যি ভালো রেজাল্ট করেছে।
রাগিব ভাই,
সহমত…আপনি ঠিক বলেছেন…
আমার অবশ্য টিউশনি না করাতে করাতে অভ্যাস হয়ে গেছে …এখন আর টিউশনির অফার আসলেও করাতে ইচ্ছে করে না…
বিপ্র, তোমার দেখি টিউশনির ভাগ্য খুবই খারাপ।
তবে, টাকা কামানোর বাইরে টিউশনির আরো উপকারিতা আছে, যা হয়তো অনেকেই খেয়াল করে না। আর তা হচ্ছে, টিউশনির মাধ্যমে আমরা অনেক বেশী মানুষের সাথে মিশতে পারি। এটা আমাদের মধ্যে নতুন ধরণের একটা জীবনবোধ তৈরীতে সাহায্য করে আর সর্বোপরি এটা সহনশীলতা শেখায়। এটা গেলো একটা দিক, অন্য দিকে, তোমার কি মনে হয়না ১৪-১৮ বছরের যেকোন ছাত্র বা ছাত্রী ১৯-২৪ বছরের যে কারো কাছে তার সমস্যাগুলো কে য়েভাবে ভয়হীনভাবে উপস্থাপন করতে পারবে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষকের কাছে (কিছু ব্যাতিক্রম বাদে) তা তুলে ধরা অসম্ভব? তবে টিউশনি যদি হয় কেবল বাণিজ্যের জন্য, তবে তা এই মূহুর্ত থেকে বন্ধ করে দেয়া উচিৎ।।