সিডির ২৫ বছর
গান ভালোবাসেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর। এককালে গান শোনার প্রধান মাধ্যম ছিল গ্রামফোন বা কলের গান। গানের থাল হিসেবে পরিচিত সেই গ্রামোফোনের রেকর্ডের দিকে তাকিয়ে মানুষ অবাক বিস্ময়ে ভাবতো কিভাবে এই থালের ভেতর আটকে রাখা হয় শিল্পীর কন্ঠ!পরিবর্তন পৃথিবীর একটি স্বাভাবিক নিয়ম। একদিন দেখা গেলো, গবেষক আর প্রকৌশলীদের পাল্লায় পড়ে সেই থালের আকার অনেক কমে এসেছে, শুধু যে কমে এসেছে তা না…কমপেক্ট ডিস্ক বা সিডি নামের সেই গানের থালটি সময়ের মতোই আধুনিক। এরপর দেখতে দেখতে ২৫ বছর কেটে গেছে। সিডির উদ্ভাবন শুধু সংগীত জগতে নয় প্রযুক্তির ইতিহাসেও একটি বড় মাইল ফলক। তথ্য সংরক্ষন এবং সংগীত এই দুটি মাধ্যমে আর কোন প্রযুক্তি পন্য এতো দীর্ঘ সময় জনপ্রিয়তা ধরে রাখেনি আর রাখবে কিনা সন্দেহ আছে।
গ্রামোফোনের রেকর্ডের বিকল্প কিছু ভাবা হচ্ছিল অনেকদিন ধরেই। সেই বিকল্পের জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে জার্মানীর ফিলিপস এবং জাপানের সনি। আসুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক সিডির জন্ম ইতিহাস এবং পথচলার গল্প…
-১৯৭০ সালে ফিলিপস এএলপি (audio long play সংক্ষেপে ALP) অডিও ডিস্ক সিস্টেম নিয়ে কাজ শুরু করে।এই প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল লেজার টেকনোলজি ব্যবহার করে ভিনাইল রেকর্ডের প্রতিদ্বন্ধী হবে এমন কিছু উদ্ভাবন করা।
-ফিলিপসের অডিও ডিভিশনের পরিচালক লু অটেন্স সবর্প্রথম পরামর্শ দেন, এক ঘন্টার মিউজিক সম্বলিত এএলপি ডিস্ক হবে প্রচলিত ভিনাইল রেকর্ডের চেয়ে ছোট। প্রথমে ভাবা হয়েছিলো এই নতুন ফরম্যাটটির ব্যাসার্ধ হবে ১০ সেন্টিমিটার।
-১৯৭৭ সালে ফিলিপস নতুন অডিও ফরম্যাট নিয়ে জোড়ে সোরে কাজ শুরু করে। এই নতুন অডিও ফরম্যাটের নামও ঠিক করা হয় কয়েকটি- মিনি র্যাক, মিনি ডিস্ক এবং কমপেক্ট র্যাক।
-অবশেষে ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত হয় কমপেক্ট ডিস্ক বা সিডি। ঠিক এক সপ্তাহ পর এই নতুন ফরম্যাটটিকে কিভাবে আরোও উন্নত করা যায় সে লক্ষ্যে জাপানের সনি কর্পোরেশনের সাথে চুক্তি করে ফিলিপস। প্রাথমিকভাবে এক ঘন্টার অডিও ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন ডিস্ক তৈরির কথা থাকলেও পরবর্তীতে তা ৭৪ মিনিটে উন্নীত করা সম্ভব হয়।১৯৮০ সালে ফিলিপস এবং সনি যৌথভাবে তৈরি করে ‘রেড বুক’ নামের কমপেক্ট ডিস্ক।
-১৯৮২ সালে ফিলিপস প্রথম বারের মতো বানিজ্যিকভাবে সিডি প্লেয়ার বাজারে ছাড়ে। এর মূল্য ছিলো প্রায় ১০০০ ইউরো। প্রথমদিকে শুধুমাত্র ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের আলব্যামই সিডি আকারে বাজারে ছাড়া হয়। কারন রক এবং পপ মিউজিকের চেয়ে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের ভক্তরাই গাঁটের পয়সা বেশি খরচ করতে রাজী থাকেন সবসময়।
-সিডি আকারে প্রথম অডিও আলব্যাম The Visitors বাজারে ছাড়ে বিখ্যাত ব্যান্ড ABBA ১৯৮৫ সালে বাজারে আসে Dire Strait এর বিখ্যাত আলব্যাম Brothers In Arms। মূলত এই অলব্যামটিই সিডিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছে দেয় এবং সিডি প্লেয়ারের জনপ্রিয়তার কাছে ক্রমশই ম্লান হতে থাকে অন্যান্য অডিও প্লেয়ার। আলব্যামটি বিক্রি হয় এক মিলিয়নের বেশি এবং বিক্রির দিক থেকে এ যাবতকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিডি আলব্যাম নামও Brothers In Arms
-২০০০ সালে সারাবিশ্বে সিডি আলব্যাম বিক্রির পরিমান ছিল ২.৪৫৫ বিলিয়ন আর গত বছর ছিল ১.৭৫৫ বিলিয়ন। এ পযর্ন্ত সারাবিশ্বে সিডি বিক্রি হয়েছে ২০০ বিলিয়নের বেশি। অনলাইনে ডাউনলোডের সুবিধা বেড়ে যাওয়ায় গত এক দশকে সিডি বিক্রির হার কমছে।
প্রকৃতিতে যেমন বিবতর্ন ঘটছে, তেমনি ঘটছে প্রযুক্তির বিশ্বেও। সময়ের সাথে বদলে যায় অনেক কিছুই । প্রযুক্তি পন্যের বাজারে এই বদলের গতিটা বরাবরই একটু বেশি। ফ্লপির যুগ শেষ। ডিভিডির পর এখন শোনা যাচ্ছে ব্লু –রে ডিস্কের কথা। একদিন সিডি হারিয়ে যাবে, সিডির বদলে আসবে নতুন কিছু। তবু প্রযুক্তি পন্যের বাজারে দাপটের সাথে ২৫ বছর পার করাটা কিন্তু মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। তাই বলতেই হয়…জয়তু সিডি!
[টেকনোলজি টুডে এবং আমাদের প্রযুক্তি ফোরামে প্রকাশিত]
প্রকাশকালঃ 14 Nov 2007 11:09 am 0 টি মন্তব্য


