কিছুদিন আগের কথারাত দেড়টার মতোঘুমুতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিএমন সময় মোবাইলে এক বন্ধুর কল আসলোকল ধরার সাথে সাথেই ঝাড়ি শুরু ব্যাটা, এইটা কি বাংলা সাইট বানাইছস…লেখাতো সব বাক্স বাক্স দেখায় অন্য বাংলা সাইট তো ভালোই দেখায়আমি পত্রিকার সাইটের বাংলা লেখাতো ভালোই দেখতে পারি শুধু তোদের সাইটে ঝামেলা… আমি এবার বললাম, দোস্ত আমাদের সাইটটা ইউনিকোড ভিত্তিক…এই সাইট দেখার জন্য পিসিতে ইউনিকোড ইনস্টল করা থাকা লাগবেএবার বন্ধুটি আরোও রেগে গেলো মনে হয়, আমি অন্য সাইটের বাংলা তো শুধু ফন্ট ইনস্টল করা থাকলেই পড়তে পারিতাহলে এই ইউনিকোড থাকায় লাভ কি? …

প্রিয় পাঠক, এটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়আমার এই বন্ধুটির মতো প্রায় অনেক কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই ইউনিকোড বিষয়টি শুনে থাকলেও এ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা নেইবাংলায় অপারেটিং সিস্টেম কিংবা বাংলায় ওয়েব সাইট ইত্যাদি কাজগুলো অনেকখানি সহজ হয়ে গেছে ইউনিকোড থাকার ফলেইবিশেষ করে বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে আমাদের দেশে একটি জোয়ার তৈরি হওয়ায় ইউনিকোড সম্পর্কে অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠেছেনইউনিকোড সম্পর্কে অনেকের মনেই অনেক প্রশ্ন আছেআজকের এই লেখায় তাদের সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো

ইউনিকোড কি?

ইউনিকোড সম্পর্কে কথা শুরু করার আগে একটু গণকযন্ত্রকে অক্ষর চেনানোর ব্যাপারটি সম্পর্কেও কথা বলে নেয়া প্রয়োজনআমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী গণকযন্ত্রটি কিন্তু কোন ভাষা, অক্ষর কিংবা বর্ণমালা কিছুই বুঝে নাসে বুঝে শুধু সংখ্যাএকথা শুনে আপনার মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে যদি গণকযন্ত্র শুধু সংখ্যাই বুঝে তবে আমরা কম্পিউটারে A B C D লিখি বা দেখি কিভাবেআসলে কম্পিউটারে প্রতিটি অক্ষরের জন্য সংখ্যা বরাদ্দ থাকেকম্পিউটারে কোন লেখা দেখার জন্য ফন্ট প্রয়োজন হয় ফন্টের কাজ হলো এই সংখ্যাকে ছবির মতো করে দেখানোফন্ট ফাইলে প্রতিটি সংখ্যার জন্য একটি করে অক্ষরের ছবি ম্যাপিং করা থাকেসেজন্যই ফন্ট ফাইলটি ইনস্টল করা না থাকলে আমরা বাক্স দেখিসাধারনত আমরা যেসব অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করি তার বেশির ভাগই ইংরেজি ভাষায়সেজন্য ইংরেজি ভাষায় ফন্ট পাওয়া বা কম্পিউটারে ইংরেজির ব্যবহার খুবই সহজঝামেলার শুরু যখন আপনি কম্পিউটারে অন্য কোন ভাষা ব্যবহার করতে চাইবেনআর সেই ঝামেলাটির সমাধান করার জন্যই ইউনিকোডের আবির্ভাবএর কাজ হলো বিশ্বের সবগুলো ভাষাকেই গণকযন্ত্রের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তোলা আর এই কাজটি যে প্রতিষ্ঠান করছে তার নাম ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম এটি একটি অলাভজনক সংস্থা এবং এর কাজ হলো বিশ্বের প্রতিটি ভাষার প্রতিটি অক্ষরের জন্য একটি করে নম্বর প্রদানের মাধ্যমে একে গণকযন্ত্রের সাথে পরিচিত করে তোলা, সেটা যে প্লাটফর্মের জন্যই হোক, যে প্রোগ্রামের জন্যই হোক, আর যে ভাষার জন্যই হোক

যেকোন ব্যাক্তি বা সংস্থা এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ গ্রহনের মাধ্যমে ইউনিকোডের বিস্তারে কাজ করে যেতে পারেনমাইক্রোসফট, এ্যাপল, আইবিএম সহ বিশ্বে নামী দামী প্রায় সব ধরনের কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার নির্মাতা ইউনিকোডের সাথে তাল মিলাতে শুরু করেছেবর্তমানে বিভিন্ন ধরনের অপারেটিং সিস্টেম এবং ব্রাউজারে ইউনিকোড সমর্থন রয়েছেএছাড়া আরোও অনেক প্রতিষ্ঠান ইউনিকোড সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠেছে

বাংলা ভাষায় ইউনিকোড আসে একটু দেরিতে; ২০০০ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে এটি ছিল ইউনিকোড ৩. সংষ্করনতবে প্রথমদিকে এতে অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছিলোএতে খন্ড-ত (ৎ), ক্ষ, রেফ, য-ফলা, দাঁড়ি ইত্যাদি ছিল নাএর ফলে শুরুতে অনেক বিতর্ক দেখা দেয়এসব সমস্যার অনেকগুলোই ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে বা সমাধান করার চেষ্টা চলছে আমাদের বাংলা ভাষা অনেক আগেই ইউনিকোডে যুক্ত হওয়া উচিত ছিলকিন্তু প্রয়োজনীয় পৃষ্টপোষকতা এবং উদ্যোগের অভাবে তা সঠিক সময়ে হয়নিবাংলাকে ইউনিকোডে যুক্ত করার ব্যাপারে আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞরা ছিলেন উদাসীনতারা এর বিশেষত্ব অনুধাবন করতে অনেকখানি বিলম্ব করে ফেলেছেনআসলে সত্যি কথা বলতে কি, বাংলা ভাষাকে ইউনিকোডে যুক্ত করার জন্য এবং প্রথমদিকের সমস্যাগুলো দূর করার জন্য বাঙ্গালীদের চেয়ে কয়েকজন বিদেশীই বেশি ভূমিকা পালন করেছেনএই বিষয়টি খুবই দুঃখজনকতবে আশার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশের বেশ কিছু তরুন প্রযুক্তিবিদ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের বাংলা ইউনিকোড টাইপিং এডিটর, ফন্ট ইত্যাদি ডেভোলপের করে তথ্যপ্রযুক্তিতে ইউনিকোড প্রযুক্তির বিকাশে ভূমিকা রাখছেনএসব সফটওয়্যার এবং ফন্টের বেশির ভাগই একদম বিনামূল্যে পাওয়া যায়বাংলা ইউনিকোড টাইপিং এডিটরের ক্ষেত্রে অভ্র নামের একটি অসাধারন সফটওয়্যার ইতোমধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে


ইউনিকোডের কেন?

অনেকেই মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করেন, ইউনিকোড ছাড়াও কম্পিউটারে বাংলা লেখা বা পড়া সম্ভবতাহলে ইউনিকোডের বিশেষত্ব কোনখানে? আসুন এবার সেই প্রশ্নটির উত্তরগুলো দেখে নেই-

সাধারন সফটওয়্যারের সাহায্যেও কম্পিউটারে বাংলা লেখা বা পড়া যায় তবে প্রচলিত পদ্ধতিটি কিন্তু সার্বজনীন নয়এক সফটওয়্যারে টাইপ করা বাংলা অন্য কোন সফটওয়্যারে সম্পাদনা করা সম্ভব নয়অর্থ্যাৎ বিশ্বের যেকোন প্রান্তে বসে আপনি কোন ফাইলের বাংলা লেখা পড়া বা সম্পাদনা করতে পারবেন নাকিন্তু কোন লেখা ইউনিকোডে লেখা হলে তা কম্পিউটারে যেকোন ইউনিকোড ফন্ট ইনস্টল করা থাকলেই পড়তে পারবেন

ইন্টারনেটে তথ্য অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে ইউনিকোড খুবই জরুরীএখন ইন্টারনেটে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাতেও ইউনিকোড ভিত্তিক তথ্য সমৃদ্ধ সাইট আছেএসব সাইট থেকে সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় তথ্য খুঁজে বের করার কাজটি ইউনিকোড না থাকলে কখনই সম্ভব হতো না উল্লেখ্য, ইউনিকোড ছাড়াও বেশ কিছু বাংলা সাইট আছে, যা অনেক সহজে পড়া গেলেও এসব সাইট থেকে সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে বাংলায় তথ্য খুঁজে বের করা সম্ভব নয়তাই হাতে গোনা কিছু পত্রিকার সাইট ছাড়া এখন ইন্টারনেটের জনপ্রিয় সাইটগুলোর বেশির ভাগই ইউনিকোড ভিত্তিক

ইউনিকোড বাংলা টাইপিং এডিটরের সাহায্যে আপনি কম্পিউটারের যেকোন ফোল্ডার বা ড্রাইভের নাম বাংলায় লিখতে পারবেনএছাড়াও এর মাধ্যমে বাংলায় ই-মেইল আদান প্রদান বা মেসেঞ্জারে চ্যাট করা যাবে

প্রতিটি কম্পিউটার ব্যবহারকারীই নিজের মাতৃভাষায় একটি অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারের ইচ্ছে পোষন করেনআর এই কাজটিই সম্ভব হচ্ছে ইউনিকোড থাকার ফলে ইতোমধ্যে লিনাক্স উবুন্টুর কল্যানে আমরা বাংলা অপারেটিং সিস্টেম শ্রাবণী এবং হৈমন্তি পেয়েছিএছাড়া আর কিছুদিনের মাঝে মাইক্রোসফটের বাংলা ভিস্তা আসার কথা রয়েছে

বাংলা ভাষায় ইউনিকোড যখন প্রথম আসে তখন অনেকেই ইউনিকোড শুনে ভ্রু কুঁচকে বলে ফেলতেন, ইউনিকোড আবার কি …ইউনিকোড না হলেও তো চলে…ইত্যাদিএই ভ্রু কুঁচকানো মানুষের দলে অনেক আইটি বিশেষজ্ঞ এবং সফটওয়্যার ব্যবসায়ীরাও ছিলেনতবে যখন তারা বুঝতে পেরেছেন ইউনিকোড না থাকলে হালে পানি পাওয়া যাবে না তখন আবার ইউনিকোডকেই গ্রহন করেছেনতবে এখনও ইউনিকোডের ব্যাপারে অনেকেই উদাসীনযেমন আমাদের দেশের বেশির ভাগ দৈনিক পত্রিকার সাইট এখনও ইউনিকোডে রুপান্তর করা হয়নিতারা এখনও ইউনিকোডের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সবটুকু সুবিধা ভোগ করতে চাইলে ইউনিকোড প্রযুক্তিকে গ্রহন করতে হবেকারন এটি সার্বজনীন; অর্থ্যাৎ এক এবং অভিন্নতাই যেকোন প্লাটফর্মে, যেকোন প্রোগ্রামে ইউনিকোড ব্যবহার করা যায়এখনও বেশ কিছু সফটওয়্যার আছে যেগুলো ইউনিকোড সমর্থন করে নাতবে সারাবিশ্বজুড়ে ইউনিকোডের প্রতি সমর্থন যেভাবে বাড়ছে তাতে একটা কথা সহজেই বলে ফেলা যায় আর তা হলো, ইউনিকোড সমর্থন না দিতে পারলে ভবিষ্যতে কোন সফটওয়্যার বাজারে টিকে থাকতে পারবে না


[
এই লেখায় ব্যবহৃত তথ্যসমূহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েব সাইট থেকে সংগৃহীত]