কিছুদিন আগে টেকনোলজি টুডে-তে আমার লেখা ওপেন সোর্স বিষয়ক একটি প্রচ্ছদ রচনা ছাপা হয়েছিলো। এর চুম্বক অংশ আমার ব্লগের পাঠকদের জন্য…

——————-

ভূমিকাঃ
স্বাধীনত সবাই চায়…সর্বক্ষেত্রে, এমনকি তথ্যপ্রযুক্তিতেও। তাই বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তিতেও সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘ওপেন সোর্স’। সারাবিশ্বে ওপেন সোর্স নিয়ে যে জাগরন সৃষ্টি হয়েছে, তার হাওয়া এসে আমাদের দেশেও লাগছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের তরূন সমাজ এই স্বাধীন সফটওয়্যারের পক্ষে সোচ্চার। ওপেন সোর্সের মানে হলো কম্পিউটারের বিভিন্ন সফটওয়্যারের সোর্স কোড বা সাংকেতিক ভাষাকে যা বিনামূল্যে ভাবে বিতরণ করা। কেন আপনি ওপেন সোর্স ব্যবহার করবেন? এই প্রশ্নের উত্তরটি কমবেশি সবার জানা। বানিজ্যিক সফটওয়্যার কিনতে হবে আপনাকে হাজার টাকায় কিন্তু ওপেন সফটওয়্যারের বেশির ভাগই আপনি ব্যবহার করতে পারবেন একদম বিনামূল্যে। তাছাড়া সোর্স কোড উন্মুক্ত থাকায় আপনি সেসব সফটওয়্যারটিকে আপনার চাহিদা অনুযায়ী উন্নতি সাধন করতে পারবেন।

ওপেন সোর্সের খুঁটিনাটি
অনেকেই ওপেন সোর্সের সাথে ফ্রি-ওয়্যার এবং ফ্রি-সফটওয়্যার এই দুটি বিষয়কে এক করে ফেলেন। এই তিনের মাঝে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। এখন এই বিষয়গুলোর মাঝে মৌলিক পার্থক্য এবং ওপেন সোর্সের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
ওপেন সোর্সের প্রথম এবং প্রধান পরিচয়টি হলো এর সোর্স কোড সবার জন্য স্বাধীন থাকবে। এর সোর্স কোড যে কেউ ইচ্ছেমতোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন করতে পারবেন, এমনকি এই সোর্স কোড ব্যবহার করে একজন নতুন সফটওয়্যারও তৈরি করতে পারবেন। যেমনঃ জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজার ফ্লক তৈরি করা হয়েছে উন্মুক্ত ওয়েব ব্রাউজার ফায়ারফক্স ইঞ্জিন ব্যবহার করে। তবে সব ওপেন সোর্স সফটওয়্যার বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। যেমনঃ মাইএসকিএল, অ্যাপাচি। ওয়েব নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কাছে এই দুটি সফটওয়্যার খুবই পরিচিত।
ফ্রি সফটওয়্যারের প্রধান পরিচয় হলো ব্যবহারের স্বাধীনতা। এসব সফটওয়্যারে আপনি ইচ্ছেমতোন ব্যবহার, কপি, পরিবর্তন, বিনামূল্যে বা অর্থের বিনিময়ে বিতরণ ইত্যাদি করার স্বাধীনতা পাবেন। সফটওয়্যারটির পরিবর্তন বা বিতরনের জন্য মূল নির্মাতাকে কোন অর্থ প্রদান করতে হবে না বা কোন ধরনের অনুমতি নেয়ারও প্রয়োজন হবে না। গনুহ (GNU) এর ভাষায় ফ্রি সফটওয়্যারের প্রধান বৈশিষ্ঠ্য হলো চারটি-
• যেকোন উদ্দেশ্যে সফটওয়ারটি চালানোর স্বাধীনতা (প্রথম স্বাধীনতা)।
• সফটওয়ারটির কার্যপদ্ধতি জেনে নিজের প্রয়োজন মত তাকে পরিবর্তন করার স্বাধীনতা (দ্বিতীয় স্বাধীনতা)। এর একটি পূর্বশর্ত হল সফটওয়ারটির সোর্সকোড পড়তে পারা।
• সফটওয়ারটির কপি পুনঃবিতরণের স্বাধীনতা, যেন আপনি আপনার প্রতিবেশিকে সাহায্য করতে পারেন (তৃতীয় স্বাধীনতা)।
• সফটওয়ারটি উন্নত করা এবং সমাজের সুবিধার্থে উন্নত সংস্করণটি সকলের ব্যবহারের জন্য প্রকাশের স্বাধীনতা (চতুর্থ স্বাধীনতা)। সফটওয়ারের সোর্সকোড পড়তে পারা এটিরও একটি পূর্বশর্ত।
ফ্রি সফটওয়্যার সম্পর্কে আরোও বিস্তারিত জানতে চাইলে গুনহ -এর ওয়েব সাইট ঘুরে আসতে পারেন। এর ওয়েব ঠিকানা হচ্ছে- http://www.gnu.org/philosophy/free-sw.bn.html

এবার দেখে নেয়া যাক, ফ্রিওয়্যারের সাথে ফ্রি সফটওয়্যারের পার্থক্য কি। ফ্রি-ওয়্যার হলো এক ধরনের সফটওয়্যার যা বিনামূল্যে শুধুমাত্র ব্যবহার করা যায়। এর সোর্সকোড উন্মুক্ত থাকে না। এতে নির্মাতার কপিরাইট থাকায় তা যে কেউ বিতরন বা বিক্রি করতে পারবেন না। তবে এতে সফটওয়্যারের ডেমো ভার্সনের চেয়ে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। আর তা হলো- নির্দিষ্ট সময় পর তা ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে না। ফ্রি সফটওয়্যারের একটি ভালো উদাহরন হচ্ছে জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজার ওপেরা। এটি বিনামূল্যে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও এর সোর্সকোড উন্মুক্ত নয়।
ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও আছে। বেশির ভাগ ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের প্রোগ্রামাররা নিজ়েদের পেশাগত কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওপেন সোর্স নিয়ে কাজ করেন বলে ওপেন সোর্স সফটওয়্যাররের উন্নয়ন কিছুটা ধীর গতিতে হয়। এছাড়া ওপেন সোর্স ব্যবহারে কোন অসুবিধার সম্মুখীন হলে বানিজ্যিক সফটওয়্যারের মতো আপনি কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাহায্য পাবেন না। তবে বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, কোন ওপেন সোর্স জনপ্রিয় হলে একে ঘিরে অনলাইনে একটি গ্রুপ বা কমিউনিটি গড়ে উঠে। এ ধরনের কমিউনিটি বা ফোরামে একজন সদস্য অন্য সদস্যকে এ ব্যাপারে সাহায্য করে থাকেন।
ওপেন সোর্সের কি মেধার অপচয়?
ওপেন সোর্স কি শুধুই মেধার অপচয়? -এই প্রশ্নটি খুবই হাস্যকর। তবুও এ প্রশ্নটি উত্থাপনের কারন হলো, অনেক মুনাফাখোর সফটওয়্যার ব্যবসায়ী দাবি করেন, ওপেন সোর্স প্রজেক্টের সাথে কাজ করা মানে হলো শুধু মেধার অপচয় আর এর মাধ্যমে একজন সফটওয়্যার নির্মাতা নিঃস্ব হয়ে যেতে পারেন। সাম্প্রতিক কালে সারাবিশ্ব জুড়ে ওপেন সোর্স আন্দোলন জোরদার হবার পর তারা এই দাবিগুলো আরোও জোর গলায় করছেন যা সাধারন মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং ওপেন সোর্স সম্পর্কে ভুল ধারনা সৃষ্টি করছে। এমন কথা যারা বলেন তাদের ওপেন সোর্স নিয়ে খুব সম্ভবত ভালো ধারনা নেই। সবকিছু না জেনে শুনে শুধু নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই তারা এমন কথা বলে থাকেন। আসুন এবার দেখা যাক, এই হাস্যকর প্রশ্নের উত্তর কি হতে পারে। ধরুন, আপনি হয়তো একটি ওপেন সফটওয়্যার তৈরি করে বিনামূল্যে বিতরন করলেন। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে আপনার এতে লাভ কি হচ্ছে। এক্ষেত্রে লাভের দিকটি আপনাকে একটু অন্যভাবে চিন্তা করতে হবে। ওপেন সোর্স কাজ সাধারনত প্রোগ্রামাররা তাদের পেশাগত কাজের অবসরে করে থাকেন। এতে তাদের কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সুনাম বৃদ্ধি পায়। এই সুনাম তাকে অন্য কোন বড় কাজ পেতে সাহায্য করে। তাছাড়া অনেক বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এই ওপেন সোর্স সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে জন্য আরোও কিছু বাড়তি সুবিধা পেতে চায়। সেক্ষেত্রে তারা সেই সফটওয়্যারটির নির্মাতার কাছ থেকে ইচ্ছেমতোন কাস্টোমাইজেশন করে নিতে পারে, যার মাধ্যমে নির্মাতা অর্থ উপার্জন করতে পারেন। সফটওয়্যারটি জনপ্রিয় হলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও ওপেন সোর্স নির্মাতা আয় করতে পারেন। এই সুযোগটি ছাড়াও সফটওয়্যারের প্রধান নির্মাতা হিসেবে কৃতিত্বটুকু তারই থাকবে। সেদিক থেকে বলা যায়, ওপেন সোর্স তৈরি করলে যে কেউ একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাবেন এমন ধারনা সম্পূর্ণ ভুল। তাছাড়া সোর্স কোড উন্মুক্ত থাকায় যে কেউ সফটওয়্যারটির উন্নতি করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় ত্রুটি (বাগ) খুঁজে বের করতে পারবেন যা পরবর্তীতে সফটওয়্যারটির উন্নয়নে প্রোগ্রামারকে সহায়তা করবে। তাই একটা কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ওপেন সোর্সে ব্যবহারকারী এবং নির্মাতা উভয়েই লাভবান হবে।
সফটওয়্যার কপিরাইট বনাম ওপেন সোর্স
বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান আছে যারা পাইরেসির অজুহাত দিয়ে ওপেন সোর্সকে রুদ্ধ করে দিতে চান। বিশেষ কিছু ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান যারা ওপেন সোর্সের অগ্রযাত্রায় নাখোশ। অনেকে একই সাথে একটি সফটওয়্যার অনেকে ব্যবহার করার বিষয়টিকেও আবার সফটওয়্যারে কপিরাইট ভঙ্গের বিষয়টিকে সম্পত্তি চুরির সাথে তুলনা করতে চান। অনেকে আবার এমন অভিযোগও করেন যে ওপেন সফটওয়্যাররের মাধ্যমে তাদের সফটওয়্যারের কপিরাইট ভঙ্গ করা হয়েছে বা এই ওপেন সফটওয়্যারটি তাদের সফটওয়্যারের সাথে হুবুহু মিল আছে! অর্থ্যাৎ উন্মুক্ত সফটওয়্যারভিত্তিক যেকোন কাজেই তারা নিজেদের কাজের মিল খুঁজে পান। অনেকে আবার একই সফটওয়্যার ক্রেতার বাইরে অন্য কেউ ব্যবহার করবেন তা ভালো চোখে দেখেন না। এ ব্যাপারে একটি উদাহরন দেয়া যেতে পারে। ধরুন, আমি একটি পন্য (মোবাইল কিংবা কম্পিউটার যাই বলুন) কিনলে আমি তা ইচ্ছেমতোন ব্যবহার করতে পারি। প্রয়োজনবোধে আমার আত্মীয় স্বজনরাও ব্যবহার করতে পারেন। কারন আমি সেই পন্যটি টাকা দিয়ে কিনেছি এবং সেই সূত্রে আমি সেটির মালিক। আমি ইচ্ছে হলে সেই পন্যটি বিক্রিও করে দেয়ার সর্বময় ক্ষমতা সংরক্ষণ করি। সেক্ষেত্রে কপিরাইট ভঙ্গ হবার কোন কারন নেই। তাহলে সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে কেন সেটি কার্যকর হবে না। তাই একটি সফটওয়্যার কিনে অনেকে ব্যবহার করা কপিরাইটের লঙ্ঘন বা চুরি এমন দাবি কিছুটা হাস্যকর বৈকি! ব্যবহারের অধিকার বা কিভাবে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করবো সেই অধিকারটুকুও ক্রেতা হিসেবে আমার থাকা উচিত।
সফটওয়্যারের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করতে অনেক সফটওয়্যার নির্মাতাই এখন কপিরাইটের মধ্যেই সীমাবন্ধ থাকছেন না। সফটওয়্যারের মালিকানাকে আরোও শক্তিশালী করতে তারা প্যাটেন্টের আশ্রয় নিচ্ছেন। কথিত আছে, প্যাটেন্ট ধারনার উদ্ভব হয়েছে প্রাচীন গ্রীসে। এর শুরুটা ছিল বেশ হাস্যকর। তখনকার দিনে কেউ কোন মজাদার খাবার রান্না করলে সেই রান্নার রেসিপিটি তার আবিষ্কার (!) হিসেবে গন্য করা হতো। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই খাবারটি অন্য কেউ রান্না করতে পারতেন না। এমন একটি হাস্যকর ধারনারই আধুনিক রূপ প্যাটেন্ট। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার প্যাটেন্টের আওতায় আনার কথা থাকলেও একসময় সফটওয়্যারকেও প্যাটেন্টের আওতায় আনা হয়। তবে সফটওয়্যার প্যাটেন্টের অপব্যবহারও কম নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা সফটওয়্যার না বানিয়ে সফটওয়্যারের ধারনাকে প্যাটেন্ট করে ফেলেন। পরে প্রায় একই ধরনের সফটওয়্যার কেউ তৈরি করলে তার বিরূদ্ধে বিভিন্ন মামলা সহ বিভিন্ন আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়রানির চেষ্টা করেন। উদ্দেশ্য বড় অংকের ক্ষতিপূরন আদায়। সফটওয়্যার প্যাটেন্টের এই অপব্যবহারের ফলে বিভিন্ন দেশের মানুষ সফটওয়্যার প্যাটেন্টের বিরূদ্ধে সোচ্চার। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই সফটওয়্যার প্যাটেন্টকে অনুৎসাহিত করা হচ্ছে।
প্যাটেন্ট কিংবা কপিরাইট যাই বলুন এ ধরনের উদ্যোগে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের মানুষের কাছে থেকে সফটওয়্যারকে আরোও হাতের নাগালের বাইরে নিয়ে যাবে। এর ফলে তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্ঠী। তাই প্যাটেন্টের মাধ্যমে ওপেন সোর্সের জয়যাত্রা যেন কোনভাবে রুদ্ধ না হয় সেদিকে আমাদের সদা সচেষ্ট থাকতে হবে।
ওপেন সোর্সঃ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
আমাদের দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে বিশাল অংকের টাকা খরচ করে সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষমতা নেই। তাই অনেক দিন ধরেই আমরা অবৈধভাবে বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে আসছি। এ চর্চাটি মোটেও সঠিক নয়। গত কিছুদিন আগে এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বাংলাদেশ পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহারে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক। আমাদের দেশে এসব ব্যাপারে আইনের কোন প্রয়োগ নেই। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আইনের প্রয়োগ হলে আমরা কিভাবে সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করবো?
এই একুশ শতকে একটি কম্পিউটার ছাড়া একজন আধুনিক মানুষের জীবন-যাপন চিন্তাই করা যায় না। আর দাম হাতের নাগালে থাকায় এখন ঘরে ঘরে কম্পিউটার থাকাটা খুবই সাধারন ব্যাপার। তবে শুধু কম্পিউটার থাকলেই তো আর চলবে না, কম্পিউটারে কাজকর্ম করতে হলে চাই সফটওয়্যার। আর সেখানেই ঘটে বিপত্তি। সাধারনত ২০/২৫ হাজার টাকা দিয়ে একজন ব্যক্তি কম্পিউটার কিনে ফেলেন। কিন্তু সফটওয়্যারের দাম একেবারেই হাতের নাগালে হওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেক কম্পিউটার ব্যবহারকারী পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। দেখা যায় সাধারন অপারেটিং সিস্টেম আর কম্পিউটারে টাইপ করার কিছু সফটওয়্যার কিনতেই একজন ব্যক্তিকে কম্পিউটারের দামের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হবে। এ যেন, কাপের চেয়ে প্লেট গরম হবার মতো অবস্থা! তাহলে কি আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রযুক্তির সুবিধা বঞ্চিত থাকবেন। এর উত্তর হবে অবশ্যই ‘না’। কারন, বানিজ্যিক সফটওয়্যারের বিকল্প হিসেবে আছে ওপেন সোর্স সফটওয়্যার। আর চোরাই সফটওয়্যার ব্যবহারের অপবাদ থেকে মুক্তি পেতে হলেও আছে একটাই সমাধান - ওপেন সোর্সের চর্চা বাড়ানো। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন দেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা। আর আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের একটি বড় অংশ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন বা পড়ছেন । কৃষকের ঘামে ভেজা টাকায় যারা একজন প্রযুক্তিবিদ হয়েছেন বা হচ্ছেন তাদের অবশ্যই দেশ ও দশের প্রতি একটি দায়বদ্ধতা আছে। তাই তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি হাজার টাকার সফটওয়্যারের বিপরীতে একটি ব্যবহার বান্ধব ওপেন সফটওয়্যার তুলে দিতে পারেন মানুষের হাতে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণের পাশাপাশি বাড়াতে পারেন নিজের দক্ষতা।

আমাদের ওপেন সোর্স
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশেও তথ্যপ্রযুক্তি মনষ্ক তরুন সমাজের মাঝে ওপেন সোর্সের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আসুন এবার এক নজরে জেনে নেয়া যাক আমাদের দেশের বিভিন্ন ওপেন সোর্স প্রতিষ্ঠান এবং তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কেঃ
অঙ্কুর-ওপেন সোর্স ও বাংলা কম্পিউটিংয়ে উল্লেখযোগ্য একটি সংগঠনের নাম ‘অঙ্কুর’। এই সংগঠনটি মূলত বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন প্রয়োজ়নীয় উন্মুক্ত সফটওয়্যারের বাংলা ইন্টারফেস তৈরির সাথে জড়িত। অন্যন্য ওপেন সোর্স প্রতিষ্ঠানের মতো অঙ্কুর-এর মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে এর স্বেচ্ছাসেবীরা। অঙ্কুর-এর স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ। এছাড়াও রয়েছেন প্রবাসে অবস্থানরত বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এসব স্বেচ্ছাসেবীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করে থাকেন। এখন পর্যন্ত অঙ্কুরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে বাঙ্গালীদের কাছে উন্মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তোলা। এছাড়া অঙ্কুরের স্বেচ্ছাসেবীরা ওপেন অফিস সহ বেশ কিছু প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত সফটওয়্যারের বাংলা অনুবাদ করেছেন। অঙ্কুরের সাথে কাজ করতে হলে প্রোগ্রামিং জানতেই হবে এমন কোন কথা নেই। আকাঁআকিঁর অভ্যাস থাকলে যে কেউ অঙ্কুরের ‘মুক্ত বাংলা ফন্ট’ প্রজেক্টে যোগ দিতে পারেন। এছাড়া সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য ‘বাংলা আর্কাইভ’ নামে অঙ্কুরের আরেকটি প্রজেক্ট রয়েছে। অঙ্কুর বিভিন্ন সময় ওপেন সোর্স সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করার পাশপাশি ওপেন সোর্স বিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালা পরিচালনা করে থাকে।
ওয়েব সাইটঃ http://www.ankurbangla.org
বিডিওএসএন (BDOSN)-বাংলাদেশে ওপেন সোর্স ভিত্তিক সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (সংক্ষেপে বিডিওএসএন) । ওপেন সোর্স ভিত্তিক এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে ২০০৫ সালের ২৪ অক্টোবর। বাংলাদেশে উন্মুক্ত সফটওয়্যার জনপ্রিয় করার পেছনে এই প্রতিষ্ঠানটির অবদান অনস্বীকার্য। উন্মুক্ত সোর্স বিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালা ছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময় উন্মুক্ত সফটওয়্যার সম্বলিত ওপেন সিডি প্রকাশ করে থাকে যা স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায়। এছাড়াও কেউ আগ্রহী হলে বিডিওএসএনের অফিস থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত উন্মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম উবুন্টুর বাংলা সংষ্করণ ‘হৈমন্তি’-এর সিডিও সংগ্রহ করতে পারেন। ওপেন সোর্সের পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানটি জনমানুষের বিশ্বকোষ হিসেবে খ্যাত উইকিপিডিয়া বাংলাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
ওয়েব সাইটঃ http://www.bdosn.org

যোগাযোগঃ বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক
২৯১ সোনারগাঁও রোড, চতুর্থ তলা, ঢাকা।
একুশেঃ স্বাধীন বাংলা কম্পিউটিংয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা ওপেন সোর্স প্রতিষ্ঠান একুশে- কাজ করছে মূলত বাংলা ভাষাভিত্তিক সফটওয়্যার নিয়ে। বিভিন্ন ধরনের উন্মুক্ত বাংলা সফটওয়্যার ছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন বাংলা কি-বোর্ডের ওয়েব ভিত্তিক সংষ্করণ বিতরন করছে। এসব ওয়েব ভিত্তিক কি-বোর্ডের মাধ্যমে কোন ধরনের বাংলা সফটওয়্যার ইনস্টল না করা থাকলেও অনলাইনে বাংলা লেখা যায়, যা ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলা কি-বোর্ডের পাশপাশি একুশে-এর উল্লেখযোগ্য ওপেন সোর্স প্রজেক্টগুলো হলো- জনপ্রিয় উন্মুক্ত ওয়েব ব্রাউজার মোজিলা ফায়ারফক্সের বাংলা সংষ্করণ, একুশে অভিধান, ওয়ার্ডপ্রেসের বাংলা তারিখের প্লাগইন ইত্যাদি।
ওয়েব সাইটঃ http://www.ekushey.org

আগেই বলেছি, বাংলাদেশের ওপেনসোর্স প্রজেক্টের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে বাংলা কম্পিউটিং। ইউনিকোড প্রযুক্তি আসায় এসব প্রজেক্টের সফল বাস্তবায়ন অনেকটাই সহজতর হয়েছে। বেশির ভাগ দেশেই কম্পিউটার ব্যবহারী চান নিজের মাতৃভাষায় একটি অপারেটিং সিস্টেম। আমাদের বাংলা ভাষাতেও এখন অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা যায়, আর তা সম্ভব হয়েছে ওপেন সোর্সের মাধ্যমেই। উন্মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম উবুন্টুর বাংলা লোকালাইজেশনের মাধ্যমে ২০০৭ সালের একুশে বইমেলায় বাংলাদেশের ওপেন সোর্স প্রতিষ্ঠান অঙ্কুর এবং সিসটেকের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হয় বাংলা অপারেটিং সিস্টেম ‘শ্রাবণী’। সম্প্রতি উবুন্টু লিনাক্সের ৭.১০ সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে বাংলা অপারেটিং সিস্টেম ‘হৈমন্তি’। । এছাড়াও ওপেন সোর্স ভিত্তিক বাংলা কম্পিউটিং-এ যেসব উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে তার মাঝে রয়েছে বিভিন্ন জনপ্রিয় কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং বুলেটিন বোর্ডের বাংলা সংষ্করণ তৈরি। বিভিন্ন ওপেন সোর্স কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা সি এম এস(CMS) -এর বাংলা সংষ্করণ তৈরি করায় খুব সহজেই যে কেউ এসব সি এম এস ব্যবহার করে বাংলায় ওয়েব সাইট তৈরি করতে পারেন। ইদানিংকালে এ ধরনের উন্মুক্ত সি এম এস ব্যবহার করে বাংলায় ব্লগ সাইট তৈরি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ সময়ের জনপ্রিয় সি এম এস ইঞ্জিনগুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে-জুমলা, দ্রুপাল, ওয়ার্ডপ্রেস। এছাড়া অনলাইনে বাংলা ফোরাম ধারনাটিও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আর তা সম্ভব হয়েছে ওপেন সোর্স ফোরাম ইঞ্জিন বা বুলেটিন বোর্ড থাকার ফলেই। ইতোমধ্যে জনপ্রিয় দুটি বুলেটিন বোর্ড- পিএইচপিবিবি এবং পানবিবি’র বাংলা সংষ্করণ তৈরি করা হয়েছে।

মুক্ত -ওপেন সোর্স বিষয়ক ই-পত্রিকা
মুক্ত ওপেন সোর্স জগতের খবরাখবর নিয়ে প্রকাশিত বাংলা অনলাইন পত্রিকা। এতে রয়েছে লিনাক্স ও ওপেনসোর্স সম্পর্কিত সাম্প্রতিক খবরাখবর, প্রতিবেদন, সফটওয়্যার রিভিউ, টিউটোরিয়াল ইত্যাদি বিভাগ। ইন্টারনেটে ওপেন সোর্স নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় অনলাইন পত্রিকা থাকলেও বাংলা ভাষায় এমন কোন অনলাইন পত্রিকা ছিল না। সেই অভাব পূরণের স্বপ্ন নিয়েই মুক্ত-এর যাত্রা শুরু।
আমাদের দেশে ওপেনসোর্সের জনপ্রিয়তা ক্রমশই বাড়ছে। তাই আশা করা যায় ওপেন সোর্স বিষয়ক অনলাইন পত্রিকা ‘মুক্ত’ ওপেন সোর্স সম্পর্কে আগ্রহী বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের বেশ কাজে লাগবে।
মুক্ত ম্যাগাজিনটি ওপেন সোর্সের মতোই সবার জন্য উন্মুক্ত। ওপেন সোর্সকে যেভাবে যে কেউ সমৃদ্ধ করতে পারেন তেমনি মুক্ত-তেও যে কেউ ওপেন সোর্স ও লিনাক্স সম্পর্কিত যেকোন ধরনের লেখা প্রকাশের মাধ্যমে পত্রিকাটিকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন। এছাড়া যে কেউ ওয়েব ঠিকানা এবং লেখকের নাম উল্লেখ করে এই সাইটের যেকোন লেখা ওয়েব কিংবা প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশ করতে পারবেন।
মুক্ত সাইটের অফিসিয়াল ব্লগ থেকে জানা গেলো, এই সাইটির কাজ শুরু হয় ২০০৬ সালের দিকে। প্রথমদিকে পিডিএফ ফরম্যাটে ম্যাগাজিন বের করার চিন্তাভাবনা করলেও পরবর্তীতে পাঠক এবং লেখক উভয়ের সুবিধার কথা বিবেচনা করে অনলাইন পত্রিকার বের করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখে পত্রিকাটির নাম রাখা হয় ‘মুক্ত’।
এই সাইটটির পেছনে যারা কাজ করছেন তারা হলেন- ইমরান হোসেন, এস.এম. ইব্রাহিম (লাভলু), অমি আজাদ, সুমিত রঞ্জন দাস এবং ইশতিয়াক আহমেদ (ফয়সাল)। এদের সবাই বিভিন্ন উন্মুক্ত সোর্স প্রজেক্টে কাজ করেছেন।
মুক্ত সাইটটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে এ সময়ের জনপ্রিয় এবং উন্মুক্ত কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম জুমলা। এবং এর বাংলা ইন্টারফেজ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে বাংলা জুমলা-র অফিসিয়াল বাংলা ল্যাংগুয়েজ প্যাক। সাইটের থিম, ব্যানার সহ যাবতীয় ডিজাইন করেছেন ইমরান হোসেন। মূলত তার প্রচেষ্টাতেই সাইটটি খুব দ্রুত আলোর মুখ দেখেছে। মুক্ত সাইটটির হোস্টিং সহায়তা দিয়েছিলেন সুমিত রঞ্জন দাস। বর্তমানে সাইটটির জন্য হোস্টিং সহায়তা দিচ্ছেন phpxperts.net এবং পিএইচপি প্রোগ্রামার হাসিন হায়দার। সাইটটির যাবতীয় কারিগরী বিষয় এবং সমস্যা দেখাশোনা করছেন ইমরান হোসেন, এস.এম ইব্রাহিম (লাভলু) ।
ওপেন সোর্স নিয়ে বাংলা ভাষায় এ ধরনের অনলাইন পত্রিকা সত্যিকার অর্থেই একটি অসাধারন উদ্যোগ।সাইটটির যাবতীয় ডিজাইনও বেশ চমৎকার। কোন লেখা ভালো লাগলে আপনি পছন্দের মানদন্ড অনুযায়ী লেখাটিতে রেটিং করতে পারবেন।এছাড়াও লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করার সুযোগ তো রয়েছেই। তবে সাইটটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। তাই লেখার পরিমানও খুব কম। তবে আশা করা যায় খুব শীঘ্রই পূর্নাঙ্গভাবে পাঠকের কাছে মুক্ত পৃথিবীর সব খবর নিয়ে হাজির হবে ‘মুক্ত’।
ওয়েব সাইটঃ http://mukto.org
শেষের কথা
প্রযুক্তির বিশ্বে ওপেন সোর্স শব্দটি বেশ পুরাতন। খুব বেশিদিন না হলেও আমাদের দেশে ওপেন সোর্স নিয়ে সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের মাঝে ব্যপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমাদের দেশের ওপেন সোর্স প্রজেক্টের বেশির ভাগই এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র বাংলা সফটওয়্যার বা সফটওয়্যারের বাংলা অনুবাদের সাথে জড়িত। ওপেন সোর্স ব্যবহার এবং বাংলা অনুবাদের পাশাপাশি আমাদের ওপেন সোর্স ভান্ডারকে সমৃদ্ধশালী করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে হলে ব্যবহার করা যায় এমন উন্মুক্ত সফটওয়্যার তৈরির মাধ্যমে সারাবিশ্বে বাংলাদেশের নাম পৌছে দিতে হবে। আশার কথা হলো, আমাদের দেশের প্রযুক্তি মনষ্ক তরুন সমাজের একটি বড় অংশ এই ওপেন সোর্স আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছেন। এ বিষয়টি খুবই ইতিবাচক। আশা করা যায় খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসে বেশ বড়সর পরিবর্তন আসবে। আসলে আমাদের মতো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে হাজার হাজার টাকা খরচ করে বানিজ্যিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা সম্ভব নয়। তাই বানিজ্যিক সফটওয়্যারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যেভাবে সারাবিশ্ব ফ্রি ও ওপেন সোর্সের পথে এগিয়ে চলেছে তেমনি আমাদেরও সে পথেই এগিয়ে যেতে হবে। ওপেন সোর্সের এখনো বেশ কিছু সমস্যা আছে একথা ঠিক। তবে চোরাই সফটওয়্যার ব্যবহারের অপবাদ ঘুচাতে হলে এখন ওপেন সোর্স ভিন্ন অন্য কোন পথ আমাদের সামনে খোলা নেই। তাই আসুন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে উন্মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করি আর এক সাথে কন্ঠ মিলিয়ে উচ্চারণ করি তথ্যপ্রযুক্তির নতুন শ্লোগান, ‘সফটওয়্যারের স্বাধীনতা চাই !’

তথ্যসূত্রঃ
http://www.gnu.org
http://www.wikipedia.org
http://www.ankurbangla.org
http://www.mukto.org
http://www.bdosn.org
http://www.ankurbangla.org
http://www.opensource.org

[এছাড়াও ইন্টারনেটের বিভিন্ন ব্লগ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে]

——————-
ওপেন সোর্সের জনক রিচার্ড স্টলম্যান
ওপেন সোর্স এবং ফ্রি সফটওয়্যার আন্দোলনের প্রবক্তা হলেন রিচার্ড স্টলম্যান।
১৯৫৩ সালের ১৬ মার্চ নিউ ইয়র্কে জন্ম নেয়া এই বিখ্যাত মার্কিন প্রোগ্রামার আজ থেকে দুই দশকেরও বেশি সময় আগে ওপেন সোর্স আন্দোলনের সূচনা করেন। উন্মুক্ত সফটওয়্যারের পক্ষে এ যাবতকালের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রবন্ধের নাম- ‘কেন সফটওয়্যারের মালিক থাকা উচিত নয়’। এ প্রবন্ধে স্টিলম্যান বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরার মাধ্যমে সফটওয়্যার কপিরাইটের পক্ষে অবস্থান গ্রহন করেছেন। লেখাটি ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। উন্মুক্ত সোর্স নিয়ে আগ্রহীরা এই লেখাটির বাংলা সংষ্করণ ইন্টারনেট থেকে পড়ে নিতে পারেন। ১৯৮৩ সালে স্টলম্যান গনু (GNU) প্রকল্প শুরু করেন। এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিনমূল্যের সফটওয়্যার ব্যবহার করে একটি পূর্নাঙ্গ অপারেটিং সিস্টেম প্রণয়ন করা।

এছাড়াও স্টলম্যান সম্পর্কে আরোও জানতে তাঁর ব্যাক্তিগত ওয়েব সাইটটিও ঘুরে আসতে পারেন- http://www.stallman.org

লিনাক্স
লিনাক্স হলো অপারেটিং সিস্টেম কার্নেল। ওপেন সোর্স ও বিনামূল্য সফটওয়্যারের ধারায় একটি উৎকৃষ্ট উদাহরন হলো লিনাক্স। ১৯৯১ সালে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লিনাস টরভেল্ট অনেকটা শখের বশেই কাজ করতে করতেই তৈরি করেন অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্সের আদি ভার্সন ‘মিনিক্স’। ঠিক একই সময়ে রিচার্ড স্টলম্যানের গনু প্রকল্পের মাধ্যমে একটি পূর্নাঙ্গ অপারেটিং সিস্টেম ‘গনু হার্ড’ উন্মুক্ত হবার অপেক্ষায়। তবে সে কাজের একটি বড় অংশ তখনও বাকী আর সেটা হলো অপারেটিং সিস্টেম কার্নেল। আর সেই কঠিন কাজটিই সহজ করে দেয় লিনাস টরভেল্টের ‘মিনিক্স’। আর এভাবেই বিশ্ববাসীর কাছে উন্মুক্ত হয় এক নতুন দুয়ার-‘লিনাক্স’। লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমের বেশির ভাগ অংশ তৈরি না করেও লিনাক্সের সাথে সাথে লিনাক্সের জনক হিসেবে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন লিনাস টরভেল্ট। শুধু তাই নয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননার পাশাপাশি টাইম ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে গত শতাব্দীর সেরা একশ ব্যাক্তির মধ্যে ষোলতম স্থানটিও দখল করে নেন লিনাস।

আজ থেকে মাত্র কিছুদিন আগেও অনেকেই মনে করতেন লিনাক্স শুধুমাত্র কম্পিউটার এক্সপার্টদের জন্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে ব্যবহার বান্ধব বিভিন্ন চেহারার লিনাক্স এ ধারনা পালটে দিয়েছে অনেকখানি। লিনাক্স ব্যবহারকারীদের সংখ্যা তাই দিন দিন বেড়েই চলছে। এছাড়া অনেক কম্পিউটার ব্যবহারকারীই নিজের অপারেটিং সিস্টেমকে মাতৃভাষায় দেখতে চান। সেই স্বপ্নটিও পূরণ হয়েছে লিনাক্স থাকার ফলে। এছাড়া বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় বড় কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় লিনাক্স ইনস্টল করা কম্পিউটার বাজারে ছাড়ার কথা জানিয়েছে যা খুবই ইতিবাচক। সব মিলিয়ে বলা যায়, ওপেন সোর্সের পতাকাবাহী লিনাক্স বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে চলেছে।