কল্পবিজ্ঞান…নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে অদ্ভুত কিছু দৃশ্য। ভিন গ্রহের প্রানীর সাথে মানুষের যুদ্ধ, কিংবা রোবট নিয়ন্ত্রিত পৃথিবী…কল্পনার সাথে বিজ্ঞান মিলে এরকম সব অবিশ্বাস্য দৃশ্য দিয়েই জন্ম নেয় এক একটি কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী। সারা বিশ্বজুড়ে রয়েছে এই কল্পবিজ্ঞানের এক বিশাল পাঠক সমাজ। আমাদের বাংলা সাহিত্যেও এখন কল্পবিজ্ঞান অসম্ভব জনপ্রিয়। আজ হঠাৎ করে মনে হলো বাংলা সাহিত্যে কল্প বিজ্ঞানের শুরু কিভাবে জানা দরকার। যথারীতি ভরসা অন্তর্জাল। আর অন্তর্জালে কোন কিছু খুঁজতে প্রথমেই কড়া নাড়ি প্রিয় বন্ধু উইকিপিডিয়ার দরজায়। বরাবরের মতো এবারও নিরাশ হলাম না, ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় পাওয়া গেলো বাংলা সাহিত্যে কল্প বিজ্ঞানের শুরু নিয়ে চমৎকার কিছু তথ্য। উইকিপিডিয়া সহ গুগলের কল্যানে অন্তর্জালের আনাচে কানাচে খুঁজে পাওয়া এসব তথ্য নিয়েই সাজানো হয়েছে-বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞান

বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের শুরু ব্রিটিশ শাসন আমলে। শুরুতে বিজ্ঞানের চেয়ে কল্পনাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অবশ্য কল্পবিজ্ঞানের নায়ক আইজ্যাক আজিমভ মনে করতেন যতক্ষন না পর্যন্ত মানুষ যুক্তি দিয়ে বিজ্ঞানকে গল্প লেখার কাজে ব্যবহার না করবে ততোক্ষন পর্যন্ত সত্যিকারের কল্পবিজ্ঞান সৃষ্টি সম্ভব নয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার না করলে ইতিহাসের পাতা থেকে দেখা যায় বাংলা সাহিত্যে প্রথম কল্পবিজ্ঞান কাহিনী শুক্র ভ্রমন। শান্তিনিকেতনের শিক্ষক জগদানন্দ রায়ের লেখা এই কল্পবিজ্ঞান কাহিনীটি প্রকাশিত হয় কল্পবিজ্ঞানের জাদুকর এইচ জি ওয়েলসের ‘The War of the Worlds’ প্রকাশিত হবার এক দশক আগে ১৮৭৯ সালে। অবশ্য কাহিনীটি লেখা হয় প্রকাশের ২২ বছর আগে ১৮৫৭ সালে।

জগদানন্দ রায়ের পাশাপাশি অনেকে বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের সূচনা করার কৃতিত্বটি দিতে চান লেখক হেমলাল দত্তকে। ১৮৮২ সালে বিজ্ঞান দর্পন পত্রিকায় দুই কিস্তিতে প্রকাশিত হয় তার লেখা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীরহস্য। ১৮৯৬ সালে বাংলার প্রথম আধুনিক বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু লিখেন কল্পকাহিনী নিরূদ্দেশের কাহিনী’, যা পরবর্তীতে পলাতক তুফাননামে প্রকাশিত হয়। ছোট্ট কুন্তল কেশরী তেলের বোতলে ঘূর্ণিঝড় বন্দী করার এই গল্প দিয়েই বাংলা সাহিত্যে সত্যিকার কল্পবিজ্ঞান যুগের সূচনা হয় বলা যায়। জগদীশ চন্দ্র বসুকে বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের জনক হিসেবে ইতিহাসে স্থান দেয়া হয়েছে।


বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের জনক জগদীশ চন্দ্র বসু

বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে নারী জাগরনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন। ১৯০৫ সালে মাদ্রাজের একটি ইংরেজি সাময়িকীতে প্রকাশ হবার তিন বছর পর এটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিকে প্রকাশিত কল্পবিজ্ঞানের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের কুহকের দেশে’, হেমেন্দ্র কুমার রায়ের মেঘদূতের মর্ত্যে আগমনইত্যাদি।

আগেই বলেছি শুরুর দিকের কল্পবিজ্ঞানে বিজ্ঞান ও যুক্তির চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে কল্পনা। সেই কল্পনার পৃথিবীতে এক নতুন যুগের করেন সত্যজিৎ রায়। ১৯৬১ সালে সন্দেশ পত্রিকায় ব্যোমযাত্রীর ডায়েরীগল্পের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় বাংলা কল্পকাহিনীর আলোচিত চরিত্র প্রফেসর শঙ্কু। দুই বাংলার পাঠকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় সত্যজিত রায়ের এই চরিত্রটি। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত প্রফেসর শঙ্কুকে নিয়ে আটত্রিশটি সম্পূর্ণ ও দুটি অসম্ম্পূর্ণ ডায়েরী প্রকাশিত হয়। সত্যজিত রায় এতো বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক হয়েও একটি কল্পবিজ্ঞান নির্ভর চলচ্চিত্র কেন নির্মান করলেন না এই প্রশ্নটি নিশ্চয়ই জাগছে আপনাদের মনে। আসুন তাহলে এবার গল্প থেকে একটু চলচ্চিত্রের দিকে চোখ ফেরানো যাক। ১৯৬২ সালে সন্দেশ পত্রিকায় সত্যজিৎ রায়ের কল্পকাহিনী বঙ্কু বাবুর বন্ধুপ্রকাশিত হয়। ১৯৬৭ সালে তিনি এই গল্পের উপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র ‘The Alien’ নির্মানের চিন্তাভাবনা শুরু করেন। হলিউডের বিখ্যাত কলম্বিয়া পিকচার্স ছবিটি প্রযোজনার দায়িত্ব নিলেও শেষপর্যন্ত এই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। ১৯৮২ সালে একই প্রযোজনা সংস্থার ব্যানারে মুক্তি পায় স্টিফেন স্পিলবার্গের সাড়া জাগানো কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্র ‘E.T.’। সত্যজিত রায়ের লেখা স্ক্রিপ্টের সাথে এই ছবির মিল পাওয়া যায় বলে দাবি অনেকেরই। যদিও স্পিলবার্গ বরাবরই তা অস্বীকার করে এসেছেন।

বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু (মাঝখানে)
শিল্পীঃ রাজর্ষি দেবনাথ | ছবিসূত্র

সত্যজিত রায়ের পাশাপাশি বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যে আরোও কয়েকজন লেখক পরিচিতি পান। তাদের মাঝে অদ্রিশ বর্ধন, মলয় রায় চৌধুরির নাম উল্লেখযোগ্য। অদ্রিশ বর্ধন বাংলা ভাষায় প্রথম কল্পবিজ্ঞান সাময়িকী আশ্চর্য-এর সম্পাদক ছিলেন।
বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যে সত্যিকার অর্থে বিজ্ঞানকে খুঁজে পাওয়া যায় এ সময়ের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমদের তোমাদের জন্য ভালোবাসাউপন্যাসের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কল্পবিজ্ঞান কাহিনীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এরপর তার লেখা ইরিনা, তারা তিনজন, অনন্ত নক্ষত্র বীথি, ফিহা সমীকরন সহ বেশ কিছু কল্পবিজ্ঞান গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এরই মাঝে সে সময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত হয় কপোট্রনিক ভালোবাসানামে একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। লেখক ঢাকা বিস্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুন। গল্পটি প্রকাশ হবার পর কে যেন অভিযোগ করলো, লেখাটি নাকি রাশিয়ান সায়েন্স ফিকশন আইভাথেকে নাকি হুবুহু কপি করা হয়েছে ! সেই তরুন লেখকের তখন বয়স কম, তার ইচ্ছে হলো সেই অভিযোগকারী মানুষটাকে ধরে কাঁচা খেয়ে ফেলেন । তিনি একটি প্রতিবাদলিপি পাঠানোর কথাও চিন্তা করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পাঠালেন না। যা করলেন তা হলো, ‘কপোট্রণিকনামে সিরিজে আকারে একের পর এক গল্প লিখতেই লাগলেন আর এভাবেই জন্ম হয় বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের। বিচিত্রায় প্রকাশিত কপোট্রনিক সিরিজটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারাকপোট্রনিক সুখ দুঃখনামে বই আকারে প্রকাশ করে।


বাংলা সাহিত্যের এ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বাংলাদেশের কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যে আরোও কিছু উল্লেখযোগ্য নাম কাজী আনোয়ার হোসেন, অনিরুদ্ধ আলম, আলী ইমাম প্রমুখ। সত্যজিত রায়ের মতো এদের অনেকের মাঝেই একই চরিত্র নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লেখার প্রবনতাও লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে কাজী শাহনূর হোসেনের ছোটমামাসিরিজের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে সেদিক থেকে মুহম্মদ জাফর ইকবাল একেবারেই আলাদা। তিনি কখনও একটি চরিত্রকে দুটি গল্পে ব্যবহার করেননি।

বাংলা ভাষায় এ পর্যন্ত বেশ কিছু কল্পবিজ্ঞান সাময়িকী প্রকাশিত হলেও কোনটাই খুব বেশিদিন টেকেনি। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত কল্পবিজ্ঞান সাময়িকীগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি সময় টিকে ছিল মৌলিক। কার্টুনিষ্ট আহসান হাবিব কতৃর্ক ১৯৯৭ সালে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। বেশ কয়েকজন তরুন কল্পবিজ্ঞান লেখক সৃষ্টির মাধ্যমে এই সাময়িকীটি বাংলাদেশে কল্পবিজ্ঞানকে জনপ্রিয় তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

অনেকেই বলেন, আজকের কল্পবিজ্ঞান আগামী দিনের বিজ্ঞান। বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের শুরুটা ছিল ফ্যান্টাসি নির্ভর এবং অনেকটা বিজ্ঞান বিবর্জিত। অনেকদিন ধরে এই ধারাই চলছিল। আধুনিক কল্পবিজ্ঞান লেখকরা সেই অপবাদটুকু কাটিয়ে উঠেছেন। আর সেই সাথে বাড়ছে বাংলা ভাষায় কল্পবিজ্ঞানের পাঠক।

[লেখাটি ইন্টারনেটে আমাদের প্রযুক্তি, সচলায়তনে প্রকাশিত]