প্রবাসের কথা…[০৩]
১।
জুবায়ের ভাইয়ের মৃত্যুসহ নানান ব্যাক্তিগত কারনে মনটা কিছুদিন ধরে বিক্ষিপ্ত। সচলায়তনে ঢুকলেই জুবায়ের ভাইয়ের একটা কথা মাথার মাঝে ঘুরপাক খায়…’ঝাঁকে মিশে বেশ ছিলাম, এখন জেনে গেলেন তো! ‘। চুপিচুপি সচলায়তন ঘুরে যাই, লগইন করতে ইচ্ছে হয় না। বিষন্ন মনটাকে আরোও বিষন্ন করতে ইচ্ছে হয় না।
২।
দ্বিতীয়দিনেই আমার সুপারভাইজার বিশাল সাইজের একটা টেকনিক্যাল রিপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে বলেন, বাইপ্রো (এইখানে বেশিরভাগ মানুষ বিপ্র উচ্চারন করতে পারে না মন খারাপ ), চাইলে তুমি কিছুদিন বাসায় বসেই পড়তে পারো। কারন এডজাস্ট হওয়ার জন্য সময়ের দরকার আছে। এখন আমারে শুধু সপ্তাহ শেষে আপডেট দিবা।
সারাদিন বাসায় বসে থাকি। বাস ভাড়া ডলার থেকে টাকায় কনভার্ট করলে কোথাও ঘুরতে বের হইতে ইচ্ছে হয় না। মাস শেষ না হলে ফান্ডিংয়ের টাকাও পাওয়া যাবে না। এখন নিজের টাকায় ঘুরতে ইচ্ছে করে না। তার উপর টরেন্টো থেকে রেজিনার বিমানের টিকেট আর এপার্টমেন্ট পাওয়ার আগে পর্যন্ত কয়েকদিনে হোটেলে থাকার জন্য বেশ কিছু ডলার খরচ হয়ে গেছে। অবশ্য এখানে বাংলাদেশের সবাই ডলারকে টাকা বলে। এতে নাকি দুঃখটা একটু কমে। তাই মাঝে বিলাসিতা করে একখান সনি ভায়ো ল্যাপটপ কিনে ফেললাম ট্যাক্সসহ প্রায় এক হাজার টাকা…থুক্কু…ডলার দিয়ে । পুরানা আসুস ল্যাপটপটা ঝামেলা করতেছিলো। হয়তো ঠেলাইয়া ধাক্কাইয়া আরোও কিছুদিন চালানো যাইতো।মনরে বুঝাইলাম কোন এক সেমিস্টারে স্যারের এসাইনমেন্ট দেখা বা TA পাইলে একটা ল্যাপটপের দাম উঠে যাবে। প্রথমে ভাবলাম ডেল কিনবো…কিংকংয়ের কাছে খোঁজখবর নিলাম। কিন্তু এইখানে সবাই দেখি ডেলরে ধুমাইয়া গালিগালাজ করে, তাই আর সাহস পাইলাম না।আইবিএমও পছন্দ হইছিল…কিন্তু সাহসে কুলাইলো না। এইখানেও একটা কাহিনী হইছে। কানাডায় বেশির ভাগ জিনিসই ১৪ দিনের মাঝে পাল্টানো যায় বা ফেরত দেয়া যায় ।ফেরত দিলে পুরা মূল্য ফেরত। ভাবলাম ১৫ দিন ইউজ কইরা দেখি, ভালো না লাগলে ফেরত দিয়া দিমু। কেনার পর প্রতিদিন ফিউচার শপের ওয়েব সাইটে উঁকি মারি দাম কমলো কিনা। ১৩ তম দিন মাঝরাতে দেখি একই দামে আরেকটা ল্যাপটপ আসছে…প্রসেসর, হার্ডডিস্ক সবই বেশি, শুধু কালারটা একটু ক্ষেত টাইপের…সিলভার; আগেরটা ছিল কালো। ভাবলাম নিয়া নেই…রং ধুইয়া তো আর পানি খামু না।আমি কালো…আমার ল্যাপটপটা অন্তত ফর্সা হোক। সাথে ১২৯ ডলার বাঁচবে। ভোরের দিকে দেখি…ওদের স্টক শেষ। মনটাই খারাপ হইয়া গেলো। সকালে উঠলাম বারোটায়। ভাবলাম একবার ফিউচার শপে ফোন করে দেখি পাওয়া যায় কিনা। অনেক খুঁজে খাঁজে বলে একটা আছে, আইসা নিয়া যাও। ………………………সিলভার কালারটা খারাপ না…চোখ সয়ে গেছে।
৩।
অলসতার কারনে প্রবাসের কথা সিরিজটা লেখা হয়ে উঠে না। তাছাড়া হাতে অনেক কাজ জমে গেছে। গাদা খানেক রিডিং ম্যাটেরিয়েল পড়ে আছে। টপিকটা সম্পর্কে আগে একটু আধটু জানতাম। তবু চাপা মেরে আর বেশিদিন চালানো যাবে না।মাঝে মধ্যে লেখা শুরু করলেই ভাবি একটা মুভি দেখি…কি-বোর্ড এই সুযোগে বিশ্রাম পায়। সন্ধ্যা হলেই বাংলাদেশে ভোর হবার অপেক্ষায় থাকি। পরিচিত যাদেরকে দেশে থাকলে মাসে একবারও যোগাযোগ হতো না, তাদেরকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে বিরক্ত করি। কথাবার্তার বড় অংশ জুড়ে থাকে খাওয়া দাওয়া প্রসঙ্গ। ওন্টারিও থেকে শর্মিষ্ঠাদি টুনার কাবাব বানানোর রেসিপি দেন। বানাতে গিয়ে দেখি, ভেঙ্গেভুঙ্গে সব ভর্তা হয়ে গেছে।নর্থ ক্যারোলিনা থেকে মামাতো বোন ফোন করে, আজকে নাকি শুটকি রান্না করেছে। মনটাই খারাপ হয়ে যায়।এইখানে শুটকি পাওয়া যায় না বাঙ্গালী কম বলে। যা পাওয়া যায় তাই রান্না করে খাই। খাবারের মাঝে বাংলাদেশ খুঁজে পাওয়ার জন্য তেলে গাদাখানেক মসলা দিয়ে দেই। তখনই মহিউদ্দিন ভাই তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে জানালা খুলে দিয়ে বলেন, তোমরা উইন্টারে কি করবা? মেসেঞ্জারে, ফেসবুকেও অনেকে জিজ্ঞেস করে কি খাই? বাইরে খাই না নিজে রান্না করে খাই। তাদের চেখে দেখার জন্য…থুক্কু…চোখে দেখার জন্য ফেসবুকে গত একমাসের খাবার দাবার আপলোড করে দিলাম। কিছু আবার আমার বন্ধু অনি রান্না করেছে।
[সংবিধিবন্ধ সতর্কীকরণঃ জিভের জল সামলাতে টিস্যু হাতের কাছে রাখুন...]

ছবিঃ খাসির মাংস

ছবিঃ মুরগীর ডাল (আলাদা ডাল রান্না করার ধৈর্য্যে কুলায় না)

ছবিঃ চিংড়ি…দেখতে ভালো হইছিলো…লবনের কারনে মুখে দিতে পারি নাই

ছবিঃ শশা দিয়ে চিংড়ির ডাল

ছবিঃ সস দিয়া মুরগী খাইতে খারাপ না…

ছবিঃ ফুলকপির তরকারি

ছবিঃ টুনা মাছের ভর্তা (এখানে ক্যানের মাছই ভরসা)

ছবিঃ স্যামন মাছ…ভাবছিলাম না জানি কি…

ছবিঃ সবজি
৪।
গত ২৯ তারিখ ক্যাম্পাসে জব ফেয়ার ছিল। বেশির ভাগই এনার্জি রিলেটেড কোম্পানি। এর পরে আছে একাউন্টিং, এমবিএ। অবাক হবার মতো বিষয় আইটি হাতে গোনা দু’একটা চোখে পড়লো। এনার্জির মাঝে পেট্টোলিয়ামের সংখ্যাই বেশি, কিছু কিছু নবায়নযোগ্য শক্তিরও আছে । যাই হোক, লাভের লাভ যেটা হয়েছে সেটা হলো প্রতিটা স্টলেই কলম, মার্কার, পেন্সিল, স্কেল, শোপিস, চকোলেট, লিপজেল সহ বিভিন্ন ধরনের গাদাখানেক ফ্রি গিফট পাওয়া গেছে। প্রতিটা স্টলে গিয়া বিশাল আগ্রহ ভরে কথা বললাম…ক্যামনে কি [শুরুতেই গিয়াই তো আর ফ্রি কলম নেয়া যায় না…ভদ্রতা বলে একটা ব্যাপার আছে ;)]।এমনকি কানাডিয়ান আর্মির স্টলে গিয়েও কথাবার্তা বলে গিফট নিলাম। কানাডার আর্মিগুলার হাবভাব মেয়েলি টাইপের…একেবারেই রুক্ষতা কিংবা নিষ্ঠুরতার ছাপ নাই।
আগামী কয়েক সেমিস্টার কলম কিনতে হবে না…ভালো থাকলেই হয়…:)
প্রকাশকালঃ 10 Oct 2008 05:16 am 0 টি মন্তব্য


