১।
এবার রেজিনায় দীর্ঘ শীতকাল। মার্চের শুরুতেও রীতিমতো ভয়াবহ ঠান্ডা। মাঝে একদিন সকালে যখন ইউনিভার্সিটিতে যাই, তখন উইন্ড চিল সহ তাপমাত্রা মাইনাস সাতচল্লিশ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ইউনিভার্সিটিতে যাবার পথে বরফে আছাড় খেলাম, তবে ভাগ্য ভালো ব্যাথ্যা তেমন পাইনি। ওয়ালমার্ট থেকে সস্তায় কেনা স্নো-বুট এক শীতেই কাবু। সেদিন সন্ধ্যায় দেশে এক মামার কাছে ফোন দিলাম। কথাপ্রসঙ্গে ঠান্ডা, বরফে আছাড় খাবার কথা বললাম। আমার সেই মামা আবার কিছুটা বিটলা কিসিমের এবং অনেকটা বন্ধুর মতোই। বরফে আছাড় খেয়ে ব্যাথ্যা পেয়েছি কিনা সেটা জিজ্ঞেস করার বদলে বললেন, তোদের ওখানে তো তাও ভালো… দেশে আছাড় খেলে বরফ লাগাতে হতো, বরফে আছাড় খেলে নিশ্চয়ই আলাদা বরফ লাগাতে হয় না।

কস্কি মমিন!

২।
ঠান্ডা যখন বাড়ে তখন কেন জানি কাজের চাপও বাড়ে। তখন মন মেজাজও খারাপ থাকে। অনেকগুলো রিপোর্ট, প্রেজেন্টেশন সামনে। আগামী সপ্তাহে প্রজেক্ট স্পন্সর সিটি অব রেজিনার সাথে মিটিং থাকায় সুপারভাইজার রীতিমতো পাগলা ঘোড়া হয়ে গেছেন। প্রতিদিন গাদাখানেক নতুন কাজ ধরিয়ে দিচ্ছেন। যে ল্যাবে সিমুলেশনের কাজ করি সেখানে আবার কিছু পোলাপানের একটা দল ড্রিল মেশিন, হাতুড়ি দিয়ে মহাউৎসাহে কি একটা মডেল বানাচ্ছে। এদের কিচির মিচিরে, হাতুড়ির শব্দে মন মেজাজ আরো খারাপ হয়ে যায়। সেই দলে আবার দুই বালিকা। ইচ্ছে হয় বলি, এসো সুন্দরী…কাঠের বদলে আমার মাথায় দুইখান হাতুড়ির বাড়ি দিয়ে যাও!

গতকাল ভয় পাচ্ছিলাম আবার সুপারভাইজার নতুন কাজ চাপিয়ে দেন কিনা। মুখটা যথাসম্ভব হাসি হাসি করে বললেন, এখন তো আমরা একটা ইউনিট রান করছি, বাকী দুইটা ইউনিট নিয়ে কিছু বলা গেলে ভালো হতো…বাকী দুইটা ইউনিট নিয়ে কি ভাবছো? বুঝতে পারলাম এতো অল্প সময়ে বাকী দুটা ইউনিট রান করার মতো অসম্ভব কাজ চাপিয়ে দেবার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছেন!

৩।
গতকাল রাতে বাসায় আড্ডা বসেছিল। অনেকগুলো সিগারেট ধ্বংস করে মধ্যরাতে ঘুমাতে গেলাম। এক ঘুমে সাড়ে দশটা। গত কদিনের ক্লান্তিতে বেশ ভালো ঘুম হয়েছে। উঠে দাঁতব্রাশ, শেভ, গোসল সেরে কয়েকজন মিলে এক আফগানী রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। গত সপ্তাহেও গিয়েছিলাম। কিন্তু যেতে যেতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল, ততোক্ষনে রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে এক ইথিওপিয়ান রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। সেদিন ভেড়ার মাংসের গন্ধে খেতে পারিনি, পুরো টাকাটাই পানিতে। আজ আফগানী রেস্টুরেন্টে রীতিমতো পেট ভরে খেলাম সবাই। ওদের খাবারও বেশ ভালো। এখানে ভিয়েতনামিজ রেস্টুরেন্টের খাবারও খারাপ না।

এ শহরে আগে বাংলাদেশের মাছ-টাছ পাওয়া যেতো না। সম্প্রতি শাহ স্টোর নামে এক নতুন দোকান খুলেছে, কাচকি থেকে ইলিশ সহ প্রায় সব ধরনের বাংলাদেশী মাছ পাওয়া যায়। সেদিন প্রায় সাড়ে সাত পাউন্ড ওজনের একটা মৃগেল মাছ আনা হলো এপার্টমেন্টে। গতকাল আড্ডা উপলক্ষ্যে সেই মাছ রান্না করলাম। মাছ ভাজতে গিয়ে গরম তেল ছিটকে পড়লো বেশ কয়েকবার। মাছ রান্না করা আসলেই ব্যাপক ঝামেলার ব্যাপার।

বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখি এপার্টমেন্টে প্রথমবারের মতো শুটকি রান্নার আয়োজন হচ্ছে। মিনাম ক্যালগেরি থেকে গতকাল লইট্টা শুটকি নিয়ে এসেছিল। এখানে অবশ্য শুটকি পাওয়া যায় না এখনও। আজ আর রান্নায় হাত লাগালাম না…

৪।
গতকাল থেকে ঠান্ডা অনেক কমেছে। আজ দুপুরে দেখলাম বরফ গলতে শুরু করেছে। সেই বরফের নিচ থেকে ক্লান্ত অবসন্ন কিছু ঘাস উঁকি দিচ্ছে। মনে হচ্ছে ওদের মাথা থেকে বিরাট এক বোঁঝা নেমে গেছে।

এখন প্রায় মধ্যরাত। বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস ২/৩ হবে। জানালা অল্প খুলে দিয়েছি। রুমে একটু একটু করে ঠান্ডা ঢুকছে। ‘জাগো’ ছবির একটা গান শুনছি…

keno dure chole ge…