১.
দিনগুলো কিভাবে চলে যায় ঠিক টের পাই না। গত বছরের ২৫ আগষ্ট দেশ ছেড়েছিলাম, গুনে গুনে ছয়টা মাস চলে গেছে। গত সেমিস্টারটা খারাপ কাটেনি।এই ভার্সিটিতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর সবমিলে মাত্র ১৫ জনের মতো বাংলাদেশী ছাত্র। এর মাঝে দু’একজন বিবাহিত ছাড়া বাকীরা জীবিত। জীবিতদের বেশিরভাগ উইকেন্ডে আড্ডা দিতাম। তবে উইন্টার শুরু হওয়াতে সবাই কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। আগের মতো আর আড্ডা জমে না। চারপাশে জমে থাকা বরফের মতোই একঘেঁয়ে দিনযাপন।  ভার্সিটি থেকে এসে ল্যাপটপ খুলে বসে থাকি,অন্তর্জালের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াই। গত সেমিস্টাররের মতো পরীক্ষামূলক রান্নাবান্নাতেও আর উৎসাহ পাই না,বরং রান্না-বান্না করতে হবে মনে হলেই খুব বিরক্ত লাগে মাঝে মধ্যে।

ইদানিং সামাজিক সাইট ফেসবুকেও অসামাজিক হয়ে পড়েছি। অন্যের দেয়ালে প্রতুত্তর দেয়া দূরে থাক, ফেসবুকে কোন কোন দিন একবারও ঢুঁ মারা হয় না। মেসেঞ্জারেও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকি। নতুন কোন আজাইরা ব্লগ লেখারও চেষ্টা করি না। শুধু বিভিন্ন সাইটে ঘুরে ঘুরে বিভিন্নজনের লেখা পড়ি। কোন কোন সময় লেখা পড়ে হাত চুলকালে বাধ্য হয়ে লগাই। গত ছ’মাস মাথার চুল কাটা হয়নি, সেগুলো ক্রমশ অবাধ্য হয়ে উঠছে। মানুষ বড় চুল ক্যাম্নে রাখে বুঝিনা, ঠান্ডা একটু কমলেই কাটাতে হবে।

২.
গত সেমিস্টারে রিডিং কোর্স নেয়ার সুবাদে শুধু প্রেজেন্টেশন আর রিপোর্ট দিয়ে পার পেয়েছি। কিন্তু এবার দুটি রেগুলার কোর্স নিয়েছি। প্রেজেন্টেশন, প্রজেক্ট আর রিপোর্টের সাথে সাথে আছে কাগজ কলমের চিরাচরিত পরীক্ষা। সাথে সাথে রিসার্সের টুকটাক সিমুলেশনের কাজ তো আছেই।

মাঝে একটা সপ্তাহ রিডিং ব্রেক ছিল। পরের সপ্তাহে মিডটার্ম। ওপেন বুক পরীক্ষা বলে গায়ে লাগাইনি তেমন একটা, শুয়ে বসে ব্রেক নিয়েছি। রিডিং ব্রেকের শেষদিকে এসে হঠাৎ খেয়াল হলো পাঠ্য বইটাই যোগাড় করা হয়নি। এতোদিন তেমন প্রয়োজন অনুভব করিনি, তাছাড়া ই-বুক তো ছিলই। স্ক্যানার থাকাতে আরেকটা কোর্সের নোট পুরোটা স্ক্যান করে ফেলেছি, কিনতে হয়নি। কিন্তু এই বইটার একটা হার্ডকপি না হলেই নয়। পরিচিত কারো কাছে বইটা পাওয়া যায়নি, লাইব্রেরীতেও নাই। এখন কী উপায়? অনলাইনে দেখলাম, রীতিমতো গদাম সাইজের এই বইটা কিনতে কমসে কম দেড়শ  ডলার বের হয়ে যাবে। ভেবে দেখলাম প্রায় ৭০০ পৃষ্টার বই কেনার থেকে একটা প্রিন্টার কিনে বইটা প্রিন্ট করে ফেললেই বরং খরচ অনেক কম পড়বে। পড়াশুনায় কপিরাইট নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভালো, দেশে থাকতে অবশ্য শখের বসে বেশ কয়েকটা কোর্সের ফটোকপির বদলে মূল বই কিনেছিলাম। এই কোর্সটা আমার রুমমেট অনিও নিয়েছে। সুতরাং,সমবায় পদ্ধতিতে প্রিন্টার কিনলে খরচ আরোও কম পড়বে। শেষমেষ যৌথভাবে একটা লেজার প্রিন্টার কেনা হলো প্রায় ৮৫ ডলার দিয়ে, এক কার্টিজে ৩০০০ পৃষ্টা প্রিন্ট করা যায়। এখানে আবার প্রিন্টারের সাথে ক্যাবল দেয় না, ক্যাবল আলাদা কিনতে হয় ৩০ ডলার দিয়ে। অনেক প্রিন্টারে আবার প্রিন্টারের দামের থেকে কালির দাম বেশি। তাহলে মানুষ কালি না কিনে প্রতিবার নতুন প্রিন্টার কিনলেই তো পারে? মার্কেটিং আর অর্থনীতির এতো মারপ্যাঁচ সহজে মাথায় ঢুকে না। বাধ্য হয়ে আলাদা ক্যাবল কিনতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হলো দেশ থেকে যে স্ক্যানার সাথে নিয়ে এসেছি এর ক্যাবল আর এই প্রিন্টারের ক্যাবল একই। এইখানেও শেষপর্যন্ত ৩০ ডলার বেঁচে গেলো! এই স্ক্যানারটা অনেক সাপোর্ট দিয়েছে বিভিন্ন সময়। মনে আছে, বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতে কিনেছিলাম। কম্পিউটারে পড়ার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো বলে বুয়েটের শেষদিকে আর পিএল-এ চোথা ফটোকপি করতে পলাশীতে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়নি। দরকারী সব চোথাপত্র স্ক্যান করে রেখে দিতাম কম্পিউটারে। দেশ ছাড়ার সময় কি মনে করে নিয়ে এলাম, এখন সুফল ভোগ করছি।

৩.
ফেব্রুয়ারি ২৪,২০০৯। রাত দেড়টা। পরদিন মিডটার্ম পরীক্ষা, কানাডা আসার পর প্রথম কাগজ কলমে আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা। ঘুমাতে যাবার আগে অনলাইনে একটু ঢুঁ মারতে গিয়ে রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। বিডিনিউজে ঢুকতে গিয়ে দেখি আর ওপেন হয়না। সচলায়তনে এসে দেখি আসলেই ঘটনা সত্য! বিভিন্ন সাইটে ইতোমধ্যে বিডিআর বিদ্রোহের লাইভ আপডেট শুরু হয়েছে। ঘুমাতে গেলাম…এপাশ-ওপাশ করতে করতেই সকাল। চোখ কচলাতে কচলাতে ল্যাপটপ খুললাম আপডেট জানার জন্য।

দুপুর ১২ টা থেকে মিডটার্ম, ২ ঘন্টার। দুপুর দুইটায় নিজের মিডটার্ম পরীক্ষা শেষ করে ছুটলাম অন্য এক বিল্ডিংয়ে আরেক মিডটার্ম পরীক্ষার ডিউটি দিতে। এই সেমিস্টারে ‘মান নিয়ন্ত্রন’ শিরোনামের একটি স্নাতক কোর্সের অ্যাসাইনমেন্ট মার্কিংয়ের জন্য টিএ পেয়েছি। পরীক্ষার ডিউটি এর বাড়তি দায়িত্ব। অনেকক্ষন ঢাকার কোন আপডেট জানিনা, সর্বশেষ কি হলো কে জানে। অস্থিরতা কাটাতে পরীক্ষাহলের তিন বালিকার দিকে কিছুক্ষণ মনযোগ দেয়ারও চেষ্টা করি। প্রকৌশল শিক্ষায় আগ্রহী বালিকাদের সংখ্যা সবখানেই কেন জানি কম।

পরীক্ষা শেষে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরেই আবার বসি ল্যাপটপের সামনে। খবরের সাথে সাথে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখি। কিছু কিছু সাইটে আসল খবরের চেয়ে গুজবই বেশী। সেসব গুজবের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিডিনিউজসহ লাইভ বাংলা চ্যানেলগুলোতে ঘুরতে থাকি। সে রাতেও আর ঘুম হয় না। সকাল ৯ টা থেকে ২/১ ঘন্টা ঘুমিয়ে ছুটতে হয় ক্লাসে………………….

৪.
আগের মতো ডালপালার ছবিও তোলা হয় না। অবশ্য তোলার উপায়ও নেই, ঠান্ডাতে বাইরে গ্লাভস পড়ে ক্যামেরা ধরাই রীতিমতো ঝামেলার ব্যাপার। এর মাঝে আমার রুমমেট ট্যাক্সসহ প্রায় সাড়ে ছয়শ ডলার দিয়ে একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনে ফেলেছে। ডিএসএলআর আগে ব্যবহার করার সুযোগ হয়নি কখনো, তাই একদিন ঠান্ডা কিছুটা কম থাকায় সেই ক্যামেরা নিয়ে বের হয়েছিলাম শেষ বিকেলে।

৫.
কিছুদিন আগেও তাস খেলতে পারতাম না। দেশে থাকতে কখনো আগ্রহ হয়নি এই খেলার প্রতি। আগের একটা পর্বে লিখেছিলাম সেই কথা। আলমগীর ভাই পড়ে বলেছিলেন, তাস খেলতে পারে না…পোলাপান ডিগ্রী পায় ক্যাম্নে! ঠান্ডায় গৃহবন্দী জীবনে কিছুটা বৈচিত্র্য আনতে সেই তাস খেলাটা শিখে ফেলেছি। তাও প্রথমদিকে জোড়-জবরদস্তি করে কয়েকজন শিখিয়েছে। মন মেজাজ ভালো থাকলে মাঝে মধ্যে এখন কেউ খেলতে না চাইলেও টেনেটুনে তাসের আড্ডা বসাই। তাস ভাগ্যের খেলা, কার্ড ঠিকঠাক মতো না আসলে বুঝেশুনে খেলেও কোন লাভ হয় না। তাস খেলা যারা  জানে না তাদেরকে আসলেই ডিগ্রী দেয়া উচিত না…